১. যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে:
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচন কমিশন সত্যিই নিরপেক্ষ ও আস্থাযোগ্য কি না। বিএনপি-পন্থী ভূমিকার অভিযোগ, এনসিপি (NCP)-এর রেজিস্ট্রেশন ও ‘শাপলা’ প্রতীক নিয়ে অযথা জটিলতা সৃষ্টি, আবার ইসলামি দলগুলোর প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) পদ্ধতির দাবি—সব মিলিয়ে কমিশনের কার্যক্রমকে ঘিরে বিতর্ক বাড়ছে। অথচ বাস্তব সত্য হলো—সংবিধান ও বিদ্যমান আইনের মধ্যে কমিশনের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা ও নমনীয়তা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে: যখন আইনই সুযোগ দিচ্ছে, তখন কমিশন কেন দ্বিধাগ্রস্ত? আর এ অবস্থায় তাদের অধীনে নির্বাচন আয়োজন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?
২. আইন ও সংবিধানের পরিসর:
বাংলাদেশের সংবিধান জাতীয় নির্বাচনের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নিশ্চয়তা দিয়েছে।
পিআর পদ্ধতি: সংবিধান ও বর্তমান নির্বাচন আইন কমিশনকে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব প্রবর্তনের পথে প্রস্তাব ও উদ্যোগের ক্ষমতা দিয়েছে। এটি নিষিদ্ধ নয়, বরং নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত সমন্বয়ের প্রশ্ন।
প্রতীক বরাদ্দ: নির্বাচন কমিশনের প্রতীক বরাদ্দবিধি অনুযায়ী নতুন প্রতীক অনুমোদনে কার্যকর কোনো আইনগত বাধা নেই। NCP-এর ‘শাপলা’ প্রতীক দাবিও কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যেই সমাধানযোগ্য।
অতএব, উভয় ক্ষেত্রেই কমিশনের হাতে আইনি ও সাংবিধানিক পথ খোলা রয়েছে।
৩. কমিশনের অবস্থান ও আস্থাহীনতা:
কমিশনের কর্মকর্তারা একদিকে বলেন আইন পরিবর্তন ছাড়া PR সম্ভব নয়, আবার প্রতীকের ক্ষেত্রে ‘আইনগত অসুবিধা’ দেখান। কিন্তু বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা একমত—এই ব্যাখ্যা আংশিক, এবং কমিশনের দায়িত্ব পালনে অনীহার প্রতিচ্ছবি। এর ফলে:
(১) রাজনৈতিক আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে।
(২) গণমাধ্যম ও জনমনে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
(৩) আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
৪. সমীচীনতার প্রশ্ন:
একটি জাতীয় নির্বাচন কেবল ‘অনুষ্ঠান’ নয়—এটি গণমানুষের আস্থা অর্জনের প্রক্রিয়া। কমিশন যখন সংবিধান ও আইনে থাকা সুযোগকে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে, তখন—
ছোট-বড় দল সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ হারায়।
ভোটপদ্ধতি ও প্রতীক নিয়ে অকারণ বিতর্ক জনমতকে বিভক্ত করে।
আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন ওঠে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
ফলে কমিশনের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও তার নৈতিক বৈধতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
৫. আস্থার সঙ্কটে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ:
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ ইতিমধ্যেই নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে গেছে। যদি নির্বাচন কমিশন নিজেদের এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, তবে তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। জনগণ যদি বিশ্বাস হারায় যে আইন থাকলেও ন্যায়বিচার হবে না, তবে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা স্থায়ীভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। আর সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
৬. উপসংহার:
বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে—চাইলে তারা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারে, চাইলে NCP-কে নতুন প্রতীক বরাদ্দ দিতে পারে। বাস্তবে কোনো অটল বাধা নেই। কিন্তু কমিশনের দ্বিধা ও অনীহা রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে। তাই এখনই প্রশ্ন জোরালোভাবে সামনে আসছে: যখন আইনই পথ দেখাচ্ছে, কমিশনের দ্বিধা কি নির্বাচনকে আস্থাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না?