
প্রথম আলো, ১৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস CNA TV-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, “বিচার ও সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে পুরনো সমস্যা ফিরবে”—যার অর্থ, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফ্যাসিবাদ ও পারিবারতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে। তাঁর এই উক্তি দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যখন তিনি নিজেই এ ঝুঁকি উপলব্ধি করছেন, তখন কেন তিনি দৃশ্যমান বিচারিক সংস্কার, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে পরিবারতন্ত্রবিরোধী ধারা সংযোজন এবং মানবাধিকার নিশ্চিতে আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে সরাসরি নির্বাচনের পথে হাঁটতে চাইছেন?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দ্বৈত অবস্থান একটি বিপজ্জনক সাংবিধানিক ফাঁদ তৈরি করতে পারে। কারণ, একদিকে তিনি জনসমক্ষে সংস্কারের অপরিহার্যতার কথা বলছেন, অন্যদিকে সেই সংস্কারের বাস্তবায়নে সময় ও উদ্যোগ নিচ্ছেন না—যা পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীন স্বার্থগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর স্বার্থরক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
এখানে আরও একটি গুরুতর দিক হলো—ড. ইউনূস এভাবে নিজের ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দের বৈধতা দান না করেই যে নির্বাচনী আয়োজন করছেন, তা কার্যত তাঁর জন্য এবং গণ-অভ্যুত্থানের নেতাদের জন্য নির্বাচনোত্তর সময়কে কঠিনতম পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে। কারণ, আইনি ভিত্তি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা ছাড়া ক্ষমতার পরিবর্তন অনেক সময় প্রতিশোধমূলক রাজনীতির দরজা খুলে দেয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, বিপ্লব বা গণআন্দোলনের পর নেতৃত্ব যদি আইনগতভাবে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী না করে, তবে তারা দ্রুতই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে।
জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে জনগণ যে মূল্য দিয়ে স্বৈরাচার ও পারিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছে, তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই সংরক্ষিত হতে পারে। অন্যথায়, আসন্ন নির্বাচন রাষ্ট্রযন্ত্রকে আবারও পুরনো ক্ষমতার গলিপথে ঠেলে দিতে পারে—যেখানে ফ্যাসিবাদ, পরিবারতন্ত্র ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন পুনর্জন্ম নেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. ইউনূস যদি সত্যিই তার বক্তব্য অনুযায়ী ফ্যাসিবাদ ও পারিবারতন্ত্রের পুনঃপ্রবেশ ঠেকাতে চান, তবে তাকে অবিলম্বে—
১. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার নিশ্চিত করা
২. নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে পরিবারতন্ত্র নিষিদ্ধ করা
৪. মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করা
৫. জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা
অন্যথায়, তাঁর এই উপলব্ধি কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর নির্বাচনের পর দেশ আবারও রাজনৈতিক অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে—যেখানে হয়তো ড. ইউনূস ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতাদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে প্রতিকূল হয়ে উঠবে।