নারায়ে তাকবীরের পথে এক তরুণীর অটল যাত্রার গল্প আজও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাতাসে ভাসে।
সেই গল্প শুরু হয় এক শীতল বিকেলে—যেদিন ক্যাম্পাস ছিল পোস্টার, স্লোগান আর নির্বাচনী উত্তেজনায় মুখর।
জকসু নির্বাচনের প্রচারণায় নেমেছিলেন এক হিজাবপরা ছাত্রী।
নাম শান্তা আক্তার—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সদস্য পদপ্রার্থী, ছাত্রশিবিরের নমিনেশনপ্রাপ্ত এক তরুণী।
ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, দৃঢ় কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করতে চেয়েছিলেন—
“নারায়ে তাকবীর—আল্লাহু আকবর।”
কিন্তু সেই মুহূর্তেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়।
বাতাস কেটে আসে বিদ্বেষের ছুরি।
প্রতিপক্ষ ছাত্রদলের হাতে ছিনিয়ে নেওয়া হয় মাইক—
কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলে প্রকাশ্যেই।
মাইক কেড়ে নেওয়া গেল।
কিন্তু বিশ্বাস?
তা রয়ে গেল অটুট।
সে মুহূর্তে শান্তা আক্তারের চোখে ভয় ছিল না—ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
যেন ইতিহাসের কোনো পুরনো অধ্যায় আবার নতুন করে খুলে বসেছে।
যেন তিনি জানতেন—এই অপমানই একদিন বিজয়ের ভূমিকা হয়ে উঠবে।
ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন প্রখ্যাত আলেম আফসারী হুজুর।
ক্যাম্পাসের কোলাহলের মাঝখানে তিনি দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকালেন।
তার দোয়া ছিল নীরব, কিন্তু ভারী।
শব্দে শব্দে যেন লেখা হলো এক প্রতিজ্ঞা—
“হে আল্লাহ, এই কন্যা ও তার সাথীদের বিজয় দান করুন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আল্লাহু আকবর’-এর ধ্বনি বুলন্দ করুন।”
দোয়া শেষ হলো।
কিন্তু ইতিহাস থামল না।
দু’দিন পর—
ভোটের বাক্স খুলতেই যেন খুলে গেল নীরবতার তালা।
ফলাফল এল বজ্রনিনাদের মতো—ভূমিধস বিজয়।
জকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির জয়ী।
শান্তা আক্তার নির্বাচিত।
যে কণ্ঠ একদিন থামাতে চাওয়া হয়েছিল,
সেই কণ্ঠই এবার বজ্রনিনাদে ফেটে পড়ল—
“নারায়ে তাকবীর—আল্লাহু আকবর!”
এই স্লোগান আর শুধু শব্দ রইল না।
তা হয়ে উঠল প্রতিরোধের কবিতা,
বিশ্বাসের ঘোষণা,
এক তরুণীর বিজয়গাথা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কেঁপে উঠল—
কংক্রিটের দেয়াল নয়,
কেঁপে উঠল ইতিহাসের আত্মা।
এই বিজয় কোনো হঠাৎ পাওয়া ফল নয়।
এটি ছিল বছরের পর বছর অবদমিত কণ্ঠের জমে ওঠা প্রতিধ্বনি।
হল দখলের রাজনীতি নয়, ভয় দেখানোর সংস্কৃতি নয়—
এই জয় জন্ম নিয়েছে শৃঙ্খলা, সাধনা ও নৈতিকতার দীর্ঘ পথচলায়।
জকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের এই জয় তাই কেবল কয়েকটি পদের হিসাব নয়।
এটি ছিল ক্যাম্পাস রাজনীতির ভাষা বদলে দেওয়ার ঘোষণা।
যেখানে মুষ্টিবদ্ধ হাতের বদলে উঠেছে প্রার্থনার হাত,
আর দখলের বদলে এসেছে দায়িত্বের শপথ।
যারা ভেবেছিল স্লোগান চেপে ধরলেই আদর্শ নিঃশব্দ হবে,
যারা ধারণা করেছিল মাইক কেড়ে নিলেই ইতিহাস থেমে যাবে—
এই ফলাফল তাদের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা।
কারণ আদর্শকে থামানো যায় না।
বিশ্বাসকে স্তব্ধ করা যায় না।
শান্তা আক্তারের কণ্ঠে ধ্বনিত “নারায়ে তাকবীর” আজ আর একার নয়—
তা হয়ে উঠেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রাজনৈতিক অভিধান।
এ গল্প কেবল একটি নির্বাচনের নয়।
এ গল্প প্রমাণ করে—
মাইক ছিনিয়ে নেওয়া যায়,
কিন্তু “নারায়ে তাকবীর—আল্লাহু আকবর” কখনো থামানো যায় না।