— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক
১. প্রারম্ভ--- ইতিহাসের দায় ও নৈতিক কর্তব্য :
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল একটি যুগান্তকারী মোড়। নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছিল একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে—ড. মুহম্মদ ইউনূসকে। তাঁর আগমনকে জাতি দেখেছিল আশার প্রতীক হিসেবে; একজন নিরপেক্ষ, দুর্নীতিবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর উপস্থিতি অনেকেই মনে করেছিলেন সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা।
কিন্তু আজ, সেই বিপ্লব-পরবর্তী এক বছর পার হতেই জাতির প্রশ্ন—এই সরকার কী দিয়েছ? আর কী দিতে ব্যর্থ হয়েছে?
২. রক্তের ঋণ ও দায়শূন্যতা :
বিপ্লবের সময় নিহত অন্যূন দুই হাজার তরুণ, মাদ্রাসাছাত্র, ও রাজনৈতিক কর্মীর রক্তে যে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল, সেই পথ আজ ইতিহাসের পাতায় নির্বাক। এখন পর্যন্ত শহিদদের তালিকা চূড়ান্ত হয়নি, আহতদের চিকিৎসা ও পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি।
আর যে DB, RAB ও পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ ছিল—তারা এখনো বহাল তবিয়তে কাজ করছে।
> “যাদের রক্তে পথ তৈরি, তাদের আজ রাষ্ট্রীয় নীরবতা উপহার!”
৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি--- রাজনৈতিক বৈষম্য ও বিশ্বাসভঙ্গ :
বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে—একটি রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে। তাদেরকে আদালতে হাজিরই হতে হয়নি। অথচ একই সময়কার অন্যান্য দল ও কর্মীদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে মামলা বহাল রয়েছে। এই দ্বিমুখী বিচার ব্যবস্থা জনমনে প্রশ্ন জাগায়—এই কি সেই ‘নৈতিকতা’ যার নামে বিপ্লব হয়েছিল?
৪. নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ--- লন্ডন বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি :
২০২৫ সালের মার্চে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
The Guardian লিখে—
> “A transitional leader is not supposed to sign political statements with the leader of a controversial past.”
(Guardian World, 26 March 2025)
এটি ছিল জাতির চোখে নিরপেক্ষতার মুখোশ খোলার মুহূর্ত।
৫. পুরনো শক্তির পুনরুত্থান---পরিবারতন্ত্র ও দলীয় আধিপত্য :
ড. ইউনূস বারবার বলেছেন, তিনি পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। অথচ আজও প্রশাসনের বহু স্তরে দেখা যায়—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাবেক নেতারা পরামর্শক, ঘনিষ্ঠ, কিংবা সরাসরি সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়োজিত।
পুরনো ছাত্রসংগঠনের নেতারা এখন নতুন রূপে ফিরে এসেছে প্রশাসনে—তারা যেন ‘নতুন জামার পুরনো শাসক’।
৬. বিচারবহির্ভূত বাহিনী বহাল--- RAB এখনো সক্রিয় :
২০০৪ সালে গঠিত RAB-এর বিরুদ্ধে রয়েছে গুম, হত্যা, এবং নির্যাতনের বহু অভিযোগ। জাতিসংঘ ও Amnesty International বহুবার এই বাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। কিন্তু ইউনূস সরকার এই বাহিনী বিলুপ্ত করেনি, বরং নতুন নামে অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে।
৭. অর্থনীতি ও দুর্নীতি----অঙ্গীকার ছিল, অর্জন নেই :
ড. ইউনূস সরকার প্রথম বছরে চেষ্টা করেছে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, SME খাতে ঋণ প্রণোদনা, এবং কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করতে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে—
জিডিপি নেমে এসেছে ৩.২%-এ,
ডলারের অভাবে খাদ্য ও ওষুধ আমদানিতে সমস্যা,
পাচার হওয়া ৯.৭ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনার কোনো পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি।
৮. বৈদেশিক কূটনীতি---ভারসাম্য না দ্বিধা :
ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও, বৈদেশিক নীতিতে দেখা গেছে দ্বৈততা।
ভারত সীমান্ত হত্যা ও ট্রানজিট ইস্যুতে নিষ্ক্রিয়,
চীন বিনিয়োগ বাড়ালেও পশ্চিমা অসন্তোষ বাড়ছে,
যুক্তরাজ্য নির্বাচন ও মানবাধিকার প্রশ্নে কড়া,
জাপান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না পেলে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় না,
কাতার শ্রমবাজারে আশ্বাস দিলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই,
পাকিস্তান-এর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা কিছুদূর এগিয়ে আবার থেমে গেছে।
৯. নির্বাচন----সময় ঠিক, প্রস্তুতি শূন্য :
ড. ইউনূস বলেছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হবে। কিন্তু:
সংবিধান খসড়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি,
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হয়নি,
ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়নি।
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেই নির্বাচন হয় না—এই বাস্তবতা এখন ক্রমশ দৃশ্যমান।
১০. সম্ভাবনা ও সংশয়ের সন্ধিক্ষণে :
এক বছরের মাথায় বলা যায়, এই সরকার এখনো বিপ্লবের প্রেরণা আর বাস্তব শাসনের চাপের মাঝখানে আটকে আছে। যাঁরা বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তাঁদের কণ্ঠ নিস্তব্ধ; আর যাঁরা দেশের দুর্নীতির স্থপতি ছিলেন, তাঁরা নতুন পরিচয়ে ফিরে এসেছেন।
ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত সততা, মানবিক উচ্চারণ ও বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা প্রশ্নাতীত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কি পারছেন নিজের অবস্থান রক্ষা করতে?
জনগণের প্রশ্ন তাই একটাই:
> “এই এক বছরে কি আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন পেয়েছি, না পুরনো দুঃশাসনেরই ‘নৈতিক সংস্করণ’?”