১. পুনরুদ্ধারের নামে পুনঃস্থাপন:
২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত “জুলাই সনদ” জাতির সামনে হাজির হয়েছে “গণঅভ্যুত্থানের রূপায়ণ” নামে। বলা হয়েছে— এটি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার নথি।
কিন্তু বাস্তবে এটি ১৯৭২ সালের সংবিধানের পুরনো গোঁড়া কাঠামোকে ঘষামাজা করে পুনরায় প্রবর্তনের এক চাতুর্যময় প্রচেষ্টা, যেখানে জনগণের মুক্তি নয়, বরং পুরনো ক্ষমতাব্যবস্থার পুনর্জন্ম ঘটানো হয়েছে।
২. সংবিধানের নামে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস :
“১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃস্থাপন”— এই শব্দবন্ধটি রাজনৈতিকভাবে মোহনীয়, কিন্তু ইতিহাস জানে, সেই সংবিধানেই রচিত হয়েছিল একদলীয় শাসনের বীজ, যা ১৯৭৫ সালে ফ্যাসিস্ট বাকশালের জন্ম দেয়।
জুলাই সনদ সেই কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই তার উপর কিছু “গণতান্ত্রিক রঙ” চাপিয়েছে, যেন জনগণকে নতুন আলোয় পুরনো ফ্রেমে বন্দি করা যায়।
> “জনগণের সার্বভৌমত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা” কথাটি যদি সত্যিই অর্থবহ হতো, তবে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতি নিয়োগব্যবস্থা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হতো— কিন্তু সনদে এসবের কোনো বাস্তব রূপরেখা নেই।
৩. নির্বাচন কমিশন--- স্বাধীনতার নামে নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ:
জুলাই সনদের অন্যতম দুর্বল অংশ হলো নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত অধ্যায়। সেখানে স্বাধীন কমিশনের গঠন, নিয়োগ প্রক্রিয়া বা জবাবদিহি— কিছুই নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
বরং “গণভোট” আয়োজনের নামে আবারও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
> “যদি নির্বাচন কমিশন জনগণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তবে গণভোটও কেবল রাষ্ট্রনাট্যের একটি দৃশ্য মাত্র।”
৪. গণআন্দোলনের চেতনা ও জুলাই সনদের বিচ্ছিন্নতা :
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মূলে ছিল জনগণের রক্ত, অগণিত শহীদের ত্যাগ, এবং ফ্যাসিবাদের পতনের দাবি।
কিন্তু ২০২৫ সালের “জুলাই সনদ” সেই ইতিহাসকে সযত্নে মুছে দিয়েছে।
সনদের তারিখও প্রমাণ করে এই বিকৃতি—
> “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে ২০২৪ সালে, অথচ সনদের নাম রাখা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই সনদ! যারা এই তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে চেয়েছেন, তারা আসলে ইতিহাস বিকৃতির অভিযাত্রায় যুক্ত।”
এই প্রশ্ন তাই এখন জাতির সামনে—
> যে সনদ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ফিরে আসার পথ বন্ধ করতে পারেনি, সেটার নাম ‘জুলাই সনদ’ হয় কীভাবে?
যে সনদে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি “চুপ্পু” আজও চুপচাপ বসে আছেন, সেটি কোন বিপ্লবের সনদ?
যদি সত্যিই জনগণের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হতো, তবে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পরই রাষ্ট্রপতি “চুপ্পু”-এর স্বয়ংক্রিয় অপসারণ হতো— সেটিই ছিল জনআকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তা ঘটেনি।
অতএব, এই সনদ প্রকৃত “জুলাই সনদ” নয়— এটি জুলাই চেতনার বিশ্বাসঘাতক সংস্করণ!
৫. জুলাইযোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন ও ইতিহাস মুছে ফেলার চক্রান্ত :
জুলাই বিপ্লবের তরুণ যোদ্ধারা যেভাবে রক্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করেছিলেন, তারা প্রত্যেকেই “জাতীয় বীর” উপাধির দাবিদার।
কিন্তু জুলাই সনদে কোথাও “জুলাইযোদ্ধা” বা “শহীদদের” প্রতি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই।
এমনকি আন্দোলনের মূল বছর—২০২৪—কেও উপেক্ষা করা হয়েছে।
তাই বলা যায়, এই সনদ স্বাক্ষর করা মানেই “জুলাইযোদ্ধাদের জাতীয় বীর ঘোষণা না-করারই অঙ্গীকারনামা”।
৬. সংস্কারের আড়ালে রাজনৈতিক পুনর্বাসন
জুলাই সনদ কোনো গণতান্ত্রিক সনদ নয়, এটি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের এক চাল।
এর কাঠামো জনগণের সার্বভৌমত্ব নয়, বরং “ক্ষমতাকেন্দ্রিক সামঞ্জস্য” বজায় রাখার দিকে লক্ষ্য করেছে—
রাষ্ট্রপতি পদে স্থিতাবস্থা বজায়।
নির্বাচন কমিশন প্রশাসনের অধীনে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নীরবতায় ঢাকা।
গণঅভ্যুত্থানের বছর ইতিহাস থেকে বাদ।
এভাবে জনগণের আন্দোলনকে আড়াল করে “সনদ” নামের প্রতীকী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে— যা কার্যত জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।
৭. মুখোশের আড়ালে প্রতারণা :
জুলাই সনদ যদি সত্যিই জনগণের সনদ হতো, তবে তা হতো শহীদের রক্তে স্বাক্ষরিত;
কিন্তু এটি স্বাক্ষরিত হয়েছে রাজনৈতিক মঞ্চের আলোয়, জনগণের অন্ধকারে নয়।
যে সনদ ফ্যাসিবাদকে ফিরিয়ে আনতে বাধা দেয়নি, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের নির্দেশ দেয়নি, ইতিহাসের বছর বদলে দিয়েছে, এবং শহীদদের সম্মান দেয়নি—
সে সনদ “জাতীয় সনদ” নয়; এটি জাতির সঙ্গে এক নতুন প্রতারণা।
৯. সংক্ষিপ্ত সারমর্ম:
জুলাই সনদ ১৯৭২ সালের সংবিধান ঘষামাজা করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পুনর্বাসন ঘটিয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করেনি, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করেনি, কিংবা জুলাইযোদ্ধাদের সম্মান দেয়নি। তাই এটি প্রকৃত অর্থে “জুলাই সনদ” নয়, বরং “জুলাই চেতনার অস্বীকৃতিপত্র”।