ভাবুন, নিউইয়র্কের জনাকীর্ণ বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনজন মানুষ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন—এক হাতে কূটনৈতিক কাগজপত্র, অন্য হাতে বিদেশি শুভানুধ্যায়ীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এনসিপি-র দুই নেতা। কিন্তু হঠাৎই যেন তাঁদের হাত ফসকে যায়, ইউনূস সাহেব একা চলে যান, আর দু’জন নেতা দাঁড়িয়ে থাকেন শূন্যতার ভিড়ে। তাঁদের দিকে তাকানো হয় না, তাঁদের কণ্ঠস্বর ভেসে যায় গগনচুম্বী ইমারতের প্রতিধ্বনিতে।
এই দৃশ্যটি শুধু নিউইয়র্ক বিমানবন্দরের নয়—এটি এক রূপক, এক ভবিষ্যৎ আশঙ্কার প্রতিচ্ছবি। জুলাই বিপ্লবের সময়ে যারা প্রাণ বাজি রেখে আন্দোলন করেছেন, সেই নেতৃবৃন্দ আজ দেশের দায়িত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাঁদের স্বপ্ন ছিল—"জুলাই সনদ" স্বাক্ষরের পর তিনি একটি গণভোটের আয়োজন করবেন, তারপর হবে Constituent Assembly নির্বাচন, আর সেই নতুন সংবিধানের অধীনে হবে জাতীয় নির্বাচন। এভাবেই বিপ্লবীরা দায়মুক্ত হবেন, জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেবেন একটি নতুন বাংলাদেশ।
কিন্তু ইতিহাস বলে, ক্ষমতার স্বাদ একবার যে পাত্রে জমে ওঠে, তার মধুরতা ছাড়তে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ড. ইউনূসও সেই পথ বেছে নেন—অর্থাৎ বিপ্লবের আইনি ভিত্তি না দিয়ে সরাসরি আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ঘোষণা করেন— তার এই সিদ্ধান্তে জুলাই যোদ্ধাদের বাঁচার কোনো পথ থাকবে না। তাঁরা হবেন পরিত্যক্ত সৈনিক, যাদের নাম থাকবে ব্যারিকেডের স্লোগানে, কিন্তু যাদের ভাগ্য ঝুলে থাকবে অন্ধকার গহ্বরে।
এখানে উপমাটা আবার ফিরে আসে। যেমন নিউইয়র্কে দু’জন নেতাকে তোপের মুখে রেখে তিনি একা চলে গিয়েছিলেন, তেমনি জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের তিনি ফেলে যাবেন অনিশ্চয়তার সাগরে। একসময়ের "উচ্চতার চরম শিখরে বসানো মানুষটি" যদি তাঁদের পাশে না দাঁড়ান, তবে বিপ্লবের ফসল শুকিয়ে যাবে অকালেই।
প্রতিবেদনটি যেন এক উপন্যাসের অধ্যায়—যেখানে চরিত্রগুলো বাস্তব, কিন্তু দৃশ্যগুলো রূপকের। নিউইয়র্কের বিমানবন্দর হয়ে ওঠে প্রতারণার মঞ্চ, জুলাই বিপ্লব হয়ে ওঠে অসমাপ্ত কাব্য, আর ড. মুহাম্মদ ইউনূস হয়ে ওঠেন সেই চরিত্র, যিনি হয়তো গল্পকে বীরত্বের সমাপ্তি দেবেন, অথবা এক চিরন্তন অপূর্ণতার বেদনা রেখে চলে যাবেন।
আজ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে দুটি চরিত্রের পথ খোলা। তিনি চাইলে হতে পারেন সেই বীর, যিনি নতুন সংবিধানের আলো জ্বালিয়ে বিপ্লবীদের স্বপ্ন পূর্ণ করবেন, যিনি দায়মুক্ত করবেন ইতিহাসের যোদ্ধাদের। আবার তিনি চাইলে হতে পারেন সেই মানুষ, যিনি কেবল নিজের কূটনৈতিক মহিমা আর ক্ষমতার মাদকতায় হারিয়ে গিয়ে চলে যাবেন একা, রেখে যাবেন অপূর্ণতার কালো দাগ।
ইতিহাস বড়ই নির্মম। যেমন নিউইয়র্কে এনসিপি-র দুই নেতা অবহেলার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলেন, তেমনি যদি জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের ভাগ্যেও সেই ছায়া নেমে আসে, তবে তাদের ত্যাগ, তাদের রক্ত আর তাদের স্বপ্ন নিভে যাবে নিঃশব্দে।
এই কারণেই আজকের প্রশ্ন: জুলাই বিপ্লব কি সত্যিই পূর্ণতার আলোয় গৌরব অর্জন করবে, নাকি নিউইয়র্কের বিমানবন্দরের মতোই তা রূপ নেবে এক পরিত্যক্ত দৃশ্যে—যেখানে নেতারা আলো থেকে ছিটকে পড়ে নিঃসঙ্গ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকবেন? আক্রান্ত হবেন অথবা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলবেন ...