ঢাকার আকাশে বর্ষার মেঘ। রাজনীতির আকাশেও মেঘ—তবে দুটো মেঘের চরিত্র এক নয়। আকাশের মেঘ থেকে বৃষ্টি নামে, আর রাজনীতির মেঘ থেকে কখনো বিবৃতি, কখনো কূটনৈতিক চাপ, কখনো আবার রহস্যময় সফর নামে!
১০ আগস্ট ২০২৬। এমনই এক রহস্যময় দিনে ঢাকায় এলেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা Research and Analysis Wing—RAW-এর প্রধান পরাগ জৈন। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ব্যাপারটি তাই নিছক ‘চা খেতে আসা’ সফর বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
তবে গোয়েন্দা প্রধানের সফর বলে এমনও নয় যে বিমান থেকে নামার সময় তাঁর হাতে কালো রঙের রহস্যময় স্যুটকেস ছিল, আর তাতে লেখা—
“বাংলাদেশের গোপন খবর—খুলবেন না!”
বাস্তবে গোয়েন্দা দুনিয়া এতটা সিনেমাটিক নয়। বরং সিনেমার চেয়েও রহস্যময়!
---
প্রথম অধ্যায়: অতিথি যখন ‘র’-প্রধান
পরাগ জৈন ভারতের RAW-এর প্রধান। অর্থাৎ ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা।
এ ধরনের একজন কর্মকর্তা কোনো দেশে এলে সাধারণত তাঁর সফরের প্রতিটি কথার অর্থ খুঁজতে শুরু করেন সাংবাদিক, কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
কারণ রাষ্ট্রদূত এলে প্রশ্ন হয়—
“কী আলোচনা হলো?”
আর গোয়েন্দা প্রধান এলে প্রশ্ন হয়—
“যা আলোচনা হয়নি, সেটাই বা কী?”
এটাই গোয়েন্দা সফরের সৌন্দর্য!
---
দ্বিতীয় অধ্যায়: কেন এখন ঢাকা?
এখানেই গল্পের আসল আকর্ষণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা কমানোর উদ্যোগ স্পষ্ট হয়েছে।
১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি “conducive environment” বা অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই দিনে RAW প্রধানের ঢাকায় উপস্থিতি তাই আলাদা করে তাৎপর্য বহন করছে।
অর্থাৎ একই দিনে—
কূটনীতির দরজায় হাইকমিশনার,
নিরাপত্তার দরজায় গোয়েন্দা প্রধান।
একজন বলছেন—
“চলুন সম্পর্ক ভালো করি।”
আর অন্যজন সম্ভবত মনে মনে বলছেন—
“ভালো করি, তবে আগে দেখি—কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে!”
---
তৃতীয় অধ্যায়: শেখ হাসিনা কি গল্পের একটি চরিত্র?
এখানে এসে গল্পটি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ৫ আগস্ট ভারতে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ১০ আগস্ট ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কথা বলেছেন।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—
RAW প্রধানের আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ কি ছিল?
উত্তর: প্রকাশ্যে নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে বিষয়টি একেবারে অপ্রাসঙ্গিকও নয়।
কারণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর একটি এখন শেখ হাসিনার অবস্থান ও তাঁর প্রত্যর্পণ।
তবে গোয়েন্দা প্রধানের সফর মানেই যে এই একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে অতিরঞ্জন।
গোয়েন্দা দুনিয়ায় একটা কথা হয়তো এমন—
> “যে বিষয় নিয়ে সবাই কথা বলে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ;
আর যে বিষয় নিয়ে কেউ কথা বলে না, সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে!”
---
চতুর্থ অধ্যায়: সীমান্ত, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক হিসাব
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সীমান্ত। সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ পাচার, মাদক, মানবপাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, উগ্রবাদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক।
তাই RAW প্রধানের মতো একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ঢাকায় এসে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করলে সেটি অস্বাভাবিক নয়।
বরং অস্বাভাবিক হবে যদি দুই দেশের সম্পর্কের এত টানাপোড়েনের পরও দুই দেশের নিরাপত্তা মহল একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে।
কারণ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটা পাশের ফ্ল্যাটের মতো।
ঝগড়া করা যায়, দরজা বন্ধ রাখা যায়—
কিন্তু পাশের বাসায় আগুন লাগলে ধোঁয়া নিজের ঘরেও ঢোকে!
---
পঞ্চম অধ্যায়: চীন-পাকিস্তান কি অদৃশ্য চরিত্র?
ভারতের কৌশলগত চিন্তায় বাংলাদেশ শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়; বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাম্প্রতিক ভারতীয় বিশ্লেষণে বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে এসব নিয়ে যে কোনো নির্দিষ্ট দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
RAW প্রধানের ঢাকা সফরকে সরাসরি “চীন ঠেকানোর মিশন” বা “পাকিস্তান ঠেকানোর মিশন” বলা যায় না।
কিন্তু ভারত যে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে—এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।
দাবার বোর্ডে রাজা-মন্ত্রী যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, পাশের ঘোড়াটি কোন দিকে যাচ্ছে সেটিও নজরে রাখতে হয়।
গোয়েন্দাদের কাজ তো সেই নজর রাখাটাই!
---
ষষ্ঠ অধ্যায়: তাহলে কি বরফ গলছে?
আমার বিশ্লেষণে, এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমানোর জন্য দুই পক্ষই যোগাযোগ বাড়াতে চাইছে—এমন ইঙ্গিত এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে।
একই দিনে ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক এবং RAW প্রধানের ঢাকায় বৈঠককে তাই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার দুটি আলাদা স্তর হিসেবে দেখা যেতে পারে।
একটি হলো—
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ।
অন্যটি—
নিরাপত্তা ও কৌশলগত যোগাযোগ।
দুইটি একসঙ্গে চললে বোঝা যায়—সম্পর্ক শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নয়, রাষ্ট্রের গভীর স্তরেও পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
---
শেষ অধ্যায়: স্যুটকেসে কী ছিল?
পরাগ জৈন ঢাকায় এলেন।
বৈঠক করলেন।
আবার চলে গেলেন।
কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কৌতূহল রয়ে গেল—
“কী কথা হলো?”
গোয়েন্দা জগত অবশ্য সাধারণ মানুষকে সব কথা বলে না। সেটাই তাদের পেশাগত সৌন্দর্য।
তাই তাঁর স্যুটকেসে কী ছিল, আমরা জানি না।
হয়তো কিছু নথি।
হয়তো কিছু প্রশ্ন।
হয়তো কিছু উত্তর।
হয়তো পুরোনো সম্পর্কের হিসাব।
আর হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি ছিল—
দুই দেশের সম্পর্কের তাপমাত্রা মাপার একটি অদৃশ্য থার্মোমিটার।
---
উপসংহার: বন্ধুত্ব হোক, কিন্তু মর্যাদার সঙ্গে
RAW প্রধানের ঢাকা সফরকে তাই শুধু একটি গোয়েন্দা সফর হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না।
এটি একই সঙ্গে নিরাপত্তা যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং দুই প্রতিবেশীর নতুন বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক, বন্ধুত্বপূর্ণ হোক, নিরাপত্তা সহযোগিতাও হোক; কিন্তু সেটি যেন হয় পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
কারণ প্রতিবেশী বদলানো যায় না।
কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলানো যায়।
আর সেই সম্পর্ক যদি হয়—
“আপনি আমার বন্ধু, আমিও আপনার বন্ধু—কিন্তু আমার ঘরের চাবি আমার পকেটেই থাকবে”
তাহলেই সেটি প্রকৃত অর্থে বন্ধুত্ব।
শেষ কথা তাই একটাই—
> ঢাকার মাটিতে ‘র’-প্রধানের পায়ের শব্দ যতটা গুরুত্বপূর্ণ,
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—ঢাকা কী বলল, দিল্লি কী শুনল,
আর আগামী দিনে দুই দেশ কীভাবে সেই কথার অর্থ বাস্তবে রূপ দেয়।