
১. ভূমিকা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ঘোষিত জাতীয় নির্বাচন নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্দোলনের সম্ভাবনা উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নির্বাচনের ময়দানে নামার কোনো প্রস্তুতি দেখাচ্ছে না; বরং তারা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী।
২. জুলাই সনদ ও প্রত্যাশিত রূপরেখা :
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা মিলে একটি ঐতিহাসিক “জুলাই সনদ” স্বাক্ষর করে। এতে তিনটি মৌলিক দাবি ছিল—
(১.)গণপরিষদ নির্বাচন করে জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়ন,
(২). সেই নতুন সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠন,
(৩). এবং পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন।
এটি ছিল জনগণের কাংক্ষিত পথ, যা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়েছিল।
৩. বর্তমান বিতর্ক ও অভিযোগ :
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জুলাই সনদের ঘোষিত পথকে পাশ কাটিয়ে ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রবল অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে—
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি নাকি আন্তর্জাতিক চাপ ও কিছু বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে তারেক রহমানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।
সমালোচকরা বলছেন, গণপরিষদ নির্বাচন ও নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরাসরি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা আসলে “জুলাই সনদ”–এর মূল চেতনাকে অস্বীকার করা।
এ কারণে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একাংশ মনে করছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জনগণের বিজয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না দিয়ে বরং পুরোনো ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
৪. সম্ভাব্য ফলাফল :
(১). রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধি : বিএনপি ও অংশবিশেষ রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনে অংশ নিলেও “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন”–এ অনড় অন্যান্য শক্তি রাজপথে নতুন আন্দোলনে নামতে পারে।
(২). আস্থাহীনতা : জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা আরও গভীর হতে পারে, কারণ তারা গণপরিষদ ও নতুন সংবিধানের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশা করেছিল।
(৩). সংঘাতের ঝুঁকি : নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, আন্দোলন-সংঘাত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা তত প্রবল হবে।
৫. রাজপথেই চূড়ান্ত ফয়সালা:
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। জুলাই অভ্যুত্থানের বিজয়ের পর জনগণ যে সনদ ও রূপরেখার মাধ্যমে রাষ্ট্র পুনর্গঠন চেয়েছিল, তা বাস্তবায়নের পরিবর্তে ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজনকে অনেকে বিকল্প এজেন্ডার অংশ হিসেবে দেখছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সত্যিই তারেক রহমানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন কি না, তা ইতিহাস যাফচাই করবে। তবে এটুকু স্পষ্ট—জুলাই সনদের চেতনা অমান্য করলে আবারও রাজপথই হয়ে উঠতে পারে জনগণের চূড়ান্ত আদালত।