১. *প্রেক্ষাপট যেভাবে তৈরি হয়েছে* :
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে নদী, ঘূর্ণিঝড়, জলবায়ু ঝুঁকি, কৃষি, মৎস্য, দারিদ্র্য ও যোগাযোগ–সংকটের ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল। এই অঞ্চলের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও শিল্পায়নের মানচিত্রে বরিশাল বিভাগ বহু বছর প্রান্তিক অবস্থানে থেকে গেছে। অথচ ভোলা, বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ দ্বীপ জেলা হিসেবে, শুধু ভৌগোলিকভাবে আলাদা নয়; প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃষি, মৎস্য, নদীবন্দর, সমুদ্র–সংলগ্নতা এবং তরুণ জনশক্তির কারণে এটি দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হতে পারত আরও আগেই।
এই প্রেক্ষাপটে ভোলা ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল, সংক্ষেপে বিডিসি, ভোলাকে নতুনভাবে ভাবার একটি নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে সামনে আসে। বিডিসির স্বপ্ন ছিল ভোলাকে কেবল একটি প্রান্তিক জেলা হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প, শিক্ষা, জ্বালানি, কৃষি, মৎস্য ও সমুদ্রসম্পদভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা। সেই স্বপ্নের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ভোলায় ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
২০১০ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বেজা, গঠনের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। শিল্পায়নকে ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে সরিয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্যের দিকে নেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় চিন্তা, তার একটি বড় হাতিয়ার ছিল অর্থনৈতিক অঞ্চল। কিন্তু ২০২২ সালের ২৫ মে বিডিসির প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে কার্যকর কোনো ইকোনমিক জোন গড়ে ওঠেনি। বরিশাল ও পটুয়াখালী, বিশেষত পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক এলাকায়, দুটি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার সমীক্ষা চলছিল। কিন্তু ভোলার বিপুল গ্যাসসম্পদ, মেঘনা–তেঁতুলিয়া নদীব্যবস্থা, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে কৌশলগত সংযোগ তখনো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
এই জায়গাতেই বিডিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এ বার্ণিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি যুক্তি দেন, বরিশাল বা পটুয়াখালীর পাশাপাশি ভোলাকেও শিল্পায়নের অগ্রাধিকার তালিকায় আনতে হবে। তাঁর যুক্তি ছিল সরল, কিন্তু শক্তিশালী: যেখানে জ্বালানি আছে, কাঁচামাল আছে, নদীপথ আছে, শ্রমশক্তি আছে এবং কৃষি–মৎস্যভিত্তিক উৎপাদনের ভিত্তি আছে, সেখানে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে না তোলা একটি নীতিগত অপচয়।
ভোলায় ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি তাই শুধু জমি নির্বাচন বা প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয় ছিল না। এটি ছিল ভোলাকে উন্নয়ন–চিন্তার কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনার একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক প্রচেষ্টা।
২. *নাগরিক বৈঠক থেকে উন্নয়ন দাবির সূচনা*:
ভোলায় ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নীতিগত আলোচনা যখন সামনে আসে, তখন অধ্যাপক এম এ বার্ণিক ভোলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বৈঠকের উদ্যোগ নেন। ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, শনিবার বিকেল চারটায় ঢাকার তেজগাঁওয়ে মাইশা লজিস্টিক অ্যান্ড কোম্পানির হলরুমে ভোলা জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক এম এ বার্ণিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড ভোলা সোসাইটির আহ্বায়ক মিয়া মোস্তফা কামাল, লালমোহন ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ হাসান, বিএনএনআরসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম বজলুর রহমান, লালমোহন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোখলেস বখসি, ব্যবসায়ী এম নজরুল ইসলাম নয়ন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. বজলুর রহমান, সাংবাদিক মো. ইব্রাহিম আকাশ, আবদুল হালিম, জসিম ফরাজি ও মো. শাহীন মৃধাসহ মোট ১১ জন।
বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বেজার অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জাতীয় পরিকল্পনা এবং বরিশাল বিভাগের পিছিয়ে পড়া অবস্থান। অধ্যাপক এম এ বার্ণিক উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে তুলে ধরেন যে দেশে প্রায় ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থাকলেও বরিশাল বিভাগ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোলার জন্য এক বা একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে নীতিগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত সংগঠিত দাবি, তথ্য–উপাত্ত ও জমির প্রস্তাবসহ সামনে এগিয়ে নিতে হবে।
বৈঠকের কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ভোলা জেলায় একটি সরকারি এবং একটি বেসরকারি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে লালমোহনের নাম আলোচনায় আসে। এর পেছনে যুক্তি ছিল, লালমোহনের ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথের সংযোগ, নদীভাঙন তুলনামূলক কম হওয়া, জমির সম্ভাব্যতা এবং ভোলার মধ্যাঞ্চলীয় অবস্থান।
এই বৈঠক বিডিসির উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়। এখানে শুধু স্বপ্নের কথা বলা হয়নি; জমি, খতিয়ান, মানচিত্র, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সমর্থন সংগ্রহের বাস্তব পরিকল্পনাও নেওয়া হয়।
৩. *খাসজমির অনুসন্ধান ও লালমোহনের প্রস্তাব*
৩০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর বিডিসির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা উপযুক্ত খাসজমি অনুসন্ধানে নামেন। ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার ফরাশগঞ্জ মৌজায় তেঁতুলিয়া নদীতে জেগে ওঠা ‘মাঝের চর’ নামে একটি নতুন চরে প্রায় ২০০ একর খাসজমির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্যকে কেন্দ্র করে ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার বিটাক মিলনায়তনে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠক ছিল বিডিসির উদ্যোগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে ভোলার লালমোহনে একটি সরকারি ইকোনমিক জোন এবং একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়। মাসিক অগ্নিবার্তা ম্যাগাজিন ২০২৪ সালের ১৩ এপ্রিল সংখ্যায় “ভোলার লালমোহনে সরকারি ইকোনমিক জোন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি” শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর বিডিসির বিশেষ বৈঠকে ভোলার লালমোহনে সরকারি ইকোনমিক জোন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।
ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক এম এ বার্ণিক। বক্তব্য দেন তথ্যপ্রযুক্তি ও উন্নয়নকর্মী এ এইচ এম বজলুর রহমান, ইউনাইটেড ভোলা সোসাইটির আহ্বায়ক মিয়া মোস্তফা কামাল, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক পরিচালক মফিজুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার মুহসিন, ইঞ্জিনিয়ার নুরুল ইসলাম, আবদুল হাই, লালমোহন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোখলেস বখসি, কামরুজ্জামান বাবুল পাটওয়ারী, জাতীয় হকার আন্দোলনের পুরোধা মো. কামাল হোসেন, ইউপি সদস্য শাহজাহান খলিফা এবং আবিদুর রহমান আকিব।
বক্তারা যুক্তি দেন, ভোলার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার চাপ, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্ভাবনা এবং নদীভাঙনমুক্ত তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থান বিবেচনায় লালমোহনকে প্রস্তাবিত ভোলা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং সরকারি ইকোনমিক জোন বাস্তবায়নের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ভোলা-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য নূরন্নবী চৌধুরী শাওন সরকারের কাছে যে পত্র দেন, সেটিও আলোচনায় আসে।
২০ অক্টোবরের বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বিডিসির সদস্য মিয়া মোস্তফা কামাল ও কামরুজ্জামান বাবুল পাটওয়ারী ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের ভবনে যান। সেখানে উপসচিব আবু হেনা মোস্তফা কামালের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। সেই আলোকে বিডিসি জমি, মানচিত্র, খতিয়ান, স্থানীয় সমর্থন এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের কাজ শুরু করে।
লালমোহনের সাতানিস্থ বদিউজ্জামাল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশারের সহযোগিতায় সরকারি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার জন্য খাসজমি–সংক্রান্ত খতিয়ান ও মানচিত্র সংগ্রহ করা হয়। মিয়া মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর থেকে তেঁতুলিয়া নদীতে জেগে ওঠা ‘মাঝের চর’ এলাকার খাসজমির মানচিত্রের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করেন। এই প্রেক্ষাপটে ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরন্নবী চৌধুরী বেজার চেয়ারম্যানের কাছে ডিও লেটার দেন, যাতে লালমোহন উপজেলার ফরাশগঞ্জ মৌজার মাঝের চর এলাকায় একটি সরকারি ইকোনমিক জোন গঠনের অনুরোধ জানানো হয়।
এই ধাপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উন্নয়ন দাবি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা শুধু আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। জমির তথ্য, প্রশাসনিক যোগাযোগ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সমর্থন এবং নাগরিক সমাজের ঐকমত্য, সব মিলিয়ে বিডিসি ভোলার দাবিকে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রস্তাবে রূপ দিতে চেষ্টা করে।
৪. *রাজনীতি, স্থান নির্বাচন ও উন্নয়ন বাস্তবতার টানাপোড়েন*:
ভোলায় ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে লালমোহনের প্রস্তাব যখন আলোচনায় আসে, তখন জেলার অন্য অংশ থেকেও বিকল্প স্থানের আলোচনা শুরু হয়। ভোলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ ভোলা সদর ও দৌলতখানের মাঝামাঝি একটি বিকল্প স্থানের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করেন বলে স্থানীয় আলোচনায় উঠে আসে।
এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা কখনোই শুধু প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। জমি নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রভাব, যোগাযোগব্যবস্থা, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ, নদীপথ, পরিবেশগত প্রভাব, বিনিয়োগকারীর আগ্রহ, স্থানীয় মানুষের গ্রহণযোগ্যতা, প্রশাসনিক সুবিধা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য, সবকিছু মিলেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত গঠিত হয়।
লালমোহনের পক্ষে বিডিসির যুক্তি ছিল শক্তিশালী। কিন্তু ভোলা সদর ও দৌলতখান–সংলগ্ন এলাকার পক্ষেও প্রশাসনিক, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক যুক্তি ছিল। উন্নয়ন পরিকল্পনায় এ ধরনের প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই প্রতিযোগিতা কি তথ্যভিত্তিক ও জনস্বার্থনির্ভর হবে, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাবের ভিত্তিতে হবে?
বিডিসির অবস্থান ছিল, ভোলায় ইকোনমিক জোন হোক, কিন্তু তা যেন ভোলার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে হয়। লালমোহনের প্রস্তাব সে কারণে শুধু একটি স্থানের দাবি ছিল না; এটি ছিল ভোলার দক্ষিণাংশকে উন্নয়ন অগ্রাধিকারে আনার দাবি।
৫. *প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিডিসির চিঠি ও ডিসি সম্মেলন*:
অধ্যাপক এম এ বার্ণিক ভোলা ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কথা জানিয়ে ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর ভোলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামানকে একটি পত্র লেখেন। পত্রে তিনি “যথাসমীচীন কার্যক্রম গ্রহণের” অনুরোধ করেন। জেলা প্রশাসক বিষয়টি বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার শওকত আলীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং পরবর্তী জেলা প্রশাসক সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে ভোলার অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেন।
২০২৪ সালের ৩ থেকে ৬ মার্চ চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বরিশাল বিভাগে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আলোচনায় ভোলা অগ্রাধিকার পায় বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় জানা যায়। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ই-পেপারের ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ সংখ্যায় “চার জেলায় অর্থনৈতিক জোন চান ডিসিরা” শিরোনামে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ।
এই পর্যায়ে বিডিসির ভূমিকা ছিল নাগরিক উদ্যোগকে প্রশাসনিক আলোচনায় পৌঁছে দেওয়া। জেলা প্রশাসক সম্মেলন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্থানীয় প্রস্তাব পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিডিসির পত্র, বৈঠক, জমির তথ্য, স্থানীয় সমর্থন এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ, সব মিলিয়ে ভোলার ইকোনমিক জোনের প্রশ্নটি জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের আলোচনায় জায়গা করে নেয়।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা দরকার। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন একক কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের উদ্যোগে হয় না। বিডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক চাপ ও প্রস্তাব তৈরির ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত, বেজার নীতি, প্রশাসনিক সুপারিশ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীর আগ্রহ মিলিয়েই প্রকল্প বাস্তবতার দিকে এগিয়েছে। বিডিসি'র কৃতিত্ব এখানেই যে, তারা ভোলার সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত ভাষায় তুলে ধরেছে এবং “ভোলায় ইকোনমিক জোন দরকার” দাবিকে নাগরিক আলোচনার বাইরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে গেছে।
৬. *ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল: নতুন মোড়*
পরবর্তী সময়ে ভোলার গ্যাস, কৃষি ও মৎস্যসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নতুন গতি পায়। ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোন নামের প্রকল্পটি এই প্রক্রিয়ার একটি বাস্তব রূপ হিসেবে সামনে আসে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোনকে প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স দিয়েছে, যা দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রথম পর্যায়ে ভোলা সদর উপজেলায় ১০২ দশমিক ৪৬ একর জমিতে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে এটি ১৫৮ একর পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। কিছু স্থানীয় আলোচনায় ভোলা সদর ও দৌলতখানের মিলিত জমির প্রসঙ্গ এলেও প্রকাশিত সংবাদে প্রথম পর্যায়ের জমি হিসেবে ভোলা সদরের ১০২ দশমিক ৪৬ একরের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে।
বেজার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এটিকে বরিশাল বিভাগের প্রথম অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাস, কৃষি ও মৎস্যসম্পদকে ভিত্তি করে একটি পরিবেশবান্ধব, শ্রমঘন এবং সম্পদনির্ভর শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে চীনের লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নাম এসেছে। ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুয়াং লাইফেং বলেছেন, তাঁরা একটি পরিবেশবান্ধব ও সার্কুলার অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছেন। তাঁর মতে, ভোলার গ্যাস ও কৃষিসম্পদের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আনা সম্ভব।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা প্রায় এক লাখ মানুষের জন্য বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্যগুলো ভোলার জন্য বড় আশার বার্তা। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স কোনো প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদনধাপ, যা প্রকল্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে এগোনোর সুযোগ দেয়। জমি উন্নয়ন, পরিবেশ ছাড়পত্র, অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ, স্থানীয় জনমত, নদী ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, শ্রমনীতি এবং রপ্তানি–বাজারসংযোগ, সবকিছু ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হবে।
৭. *গ্যাস, কৃষি, মৎস্য ও সমুদ্রসম্পদের নতুন অর্থনীতি*
ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রে আছে প্রাকৃতিক গ্যাস। দীর্ঘদিন ধরে ভোলার গ্যাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সেই গ্যাস কীভাবে স্থানীয় শিল্পায়নের ভিত্তি হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যায়নি। গ্যাস যদি কেবল জাতীয় গ্রিড বা অন্য অঞ্চলের শিল্পায়নে ব্যবহৃত হয়, অথচ ভোলার মানুষ কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে তা ন্যায্য উন্নয়ন হবে না। ভোলার গ্যাস ভোলার স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারলেই এর সামাজিক মূল্য তৈরি হবে।
এর সঙ্গে যুক্ত আছে কৃষি ও মৎস্যসম্পদ। ভোলার কৃষি উৎপাদন, বিশেষত সবজি, ধান, ডাল, তরমুজ, নারকেল, সুপারি, মরিচ ও অন্যান্য ফসল, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের ভিত্তি হতে পারে। মৎস্যসম্পদ, বিশেষ করে ইলিশসহ নদী ও সামুদ্রিক মাছ, আধুনিক ফিশ প্রসেসিং, কোল্ড চেইন, প্যাকেজিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কৃষি ও মৎস্য যদি কাঁচামাল হিসেবে ভোলা থেকে বেরিয়ে যায়, আর মূল্য সংযোজন অন্যত্র হয়, তবে ভোলা প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ থেকে বঞ্চিত থাকবে। ইকোনমিক জোনের কাজ হওয়া উচিত সেই মূল্য সংযোজনকে ভোলার ভেতরে ধরে রাখা।
এখানে সমুদ্রসম্পদভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ভোলা বঙ্গোপসাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত। নদী, মোহনা ও সমুদ্র অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মৎস্য, লবণাক্ততা–সহনশীল কৃষি, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, নৌ–মেরামত, লজিস্টিক, ঠান্ডা সংরক্ষণাগার, উপকূলীয় পর্যটন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা রয়েছে। বিডিসি যে সমুদ্রসম্পদভিত্তিক একটি বিশেষ সরকারি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, তা তাই শুধু আরেকটি শিল্পাঞ্চলের দাবি নয়; এটি ভোলাকে নীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে ভাবার দাবি।
৮. *পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের কঠিন পরীক্ষা*
ভোলায় ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় সতর্কতা হলো পরিবেশ। ভোলা একটি দ্বীপ জেলা। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুতান্ত্রিক ঝুঁকি এখানে বাস্তব। তাই এখানে শিল্পায়ন মানেই শুধু কারখানা স্থাপন নয়; এখানে শিল্পায়ন মানে পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থান শেখা।
যে কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে হলে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিতে হবে। নদীর প্রবাহ, চরভূমির স্থায়িত্ব, মাছের প্রজননক্ষেত্র, স্থানীয় কৃষিজমি, জলাশয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গ্যাস ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং শ্রমিক বসতির চাপ, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। “ইকো-ডেভেলপমেন্ট” নামটি সুন্দর, কিন্তু এই নামের মর্যাদা রাখতে হলে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত জবাবদিহি থাকতে হবে।
এখানে একটি কঠিন প্রশ্ন আছে। ভোলার মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি নদী, কৃষি, মৎস্য ও বসতি ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তা টেকসই হবে না। আবার পরিবেশের নামে যদি সব শিল্পায়ন আটকে দেওয়া হয়, তবে ভোলার তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে যাবে। তাই দরকার মাঝামাঝি কোনো অস্পষ্ট সমঝোতা নয়, বরং তথ্যভিত্তিক, পরিবেশসম্মত, জবাবদিহিমূলক এবং স্থানীয় অংশগ্রহণভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
৯. *স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন অসম্পূর্ণ*
ইকোনমিক জোনকে সফল করতে শুধু বিনিয়োগকারী আনলেই হবে না। স্থানীয় মানুষকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ করতে হবে। জমি অধিগ্রহণ বা ব্যবহার, কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার, শ্রমিক প্রশিক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুযোগ, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক জবাবদিহি, সবকিছুতে স্থানীয় অংশগ্রহণ দরকার।
ভোলার তরুণদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ এখনই শুরু করা উচিত। ইকোনমিক জোন যদি গড়ে ওঠে, কিন্তু দক্ষ কর্মী বাইরে থেকে আসে এবং স্থানীয় তরুণেরা নিরাপত্তারক্ষী, দিনমজুর বা নিম্নমজুরির কাজে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই উন্নয়ন ভোলার সামাজিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে না। তাই শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে পলিটেকনিক, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কৃষি–প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, ডিজিটাল লজিস্টিকস এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে যুক্ত করতে হবে।
ভোলায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা ও ইকোনমিক জোন একসঙ্গে ভাবা গেলে ভোলা শুধু শ্রম সরবরাহকারী জেলা হবে না; এটি জ্ঞান, দক্ষতা ও উৎপাদনের কেন্দ্র হতে পারে।
১০. *বিডিসির ভূমিকা: স্বপ্ন, চাপ ও ধারাবাহিকতা*
বিডিসির এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, নাগরিক উদ্যোগ যদি তথ্য, সংগঠন ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে কাজ করে, তবে তা প্রশাসনিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিডিসি কোনো সরকারি সংস্থা নয়। তার হাতে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তার হাতে আছে একটি জেলার স্বার্থকে সংগঠিতভাবে তুলে ধরার ক্ষমতা। উন্নয়ন দাবিকে নথিভুক্ত করা, বৈঠক করা, মানচিত্র সংগ্রহ করা, জনপ্রতিনিধির সমর্থন আনা, জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া, গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা, এসব কাজই একটি নাগরিক উন্নয়ন আন্দোলনের অংশ।
তবে বিডিসির সামনে এখন আরও বড় দায়িত্ব। ভোলায় বেসরকারি ইকোনমিক জোনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে নাগরিক নজরদারি শেষ হয়ে যায় না। বরং এখন আরও বেশি প্রয়োজন হবে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, স্থানীয় কর্মসংস্থান, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ভোলার সামগ্রিক উন্নয়ন–স্বার্থ নিশ্চিত করার কাজ। একই সঙ্গে লালমোহনসহ ভোলার দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি, বিশেষায়িত বা সমুদ্রসম্পদভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দাবিও তথ্যভিত্তিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
বিডিসির দাবি হওয়া উচিত, ভোলার উন্নয়ন যেন কোনো এক উপজেলার বিরুদ্ধে আরেক উপজেলার প্রতিযোগিতায় আটকে না যায়। ভোলার সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরা, সব অঞ্চলকে নিয়ে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা দরকার। কোথায় গ্যাসভিত্তিক শিল্প হবে, কোথায় কৃষি–প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কোথায় মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতি, কোথায় শিক্ষা ও গবেষণা, কোথায় লজিস্টিকস ও নদীবন্দর, এসব প্রশ্নকে একটি সামগ্রিক জেলা উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
১১. *সামনে এগোনোর পথ*:
ভোলার ইকোনমিক জোন নিয়ে আশাবাদ যুক্তিযুক্ত, কিন্তু অন্ধ উচ্ছ্বাস বিপজ্জনক। উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে সহজ, বাস্তবে কঠিন। জমি উন্নয়ন, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, পরিবেশ ছাড়পত্র, গ্যাস–বিদ্যুৎ, শ্রম, বাজারসংযোগ, স্থানীয় জনমত এবং প্রশাসনিক সমন্বয়, সবকিছুই সময়সাপেক্ষ। ভোলার মানুষকে তাই একদিকে আশাবাদী হতে হবে, অন্যদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
এই সতর্কতার কয়েকটি দিক আছে।
*প্রথমত*, প্রকল্পের তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে। কত জমি, কোথায়, কার মালিকানা, কী ধরনের শিল্প, কত বিনিয়োগ, কী ধরনের পরিবেশব্যবস্থা, স্থানীয় কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার কী, এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হওয়া দরকার।
*দ্বিতীয়ত*, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করতে হবে। উন্নয়ন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মানুষকে অংশীদার করতে হয়।
*তৃতীয়ত*, ভোলার গ্যাস ব্যবহারের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস যদি ভোলার শিল্পায়নের ভিত্তি হয়, তবে স্থানীয় অর্থনীতির অগ্রাধিকার থাকতে হবে।
*চতুর্থত*, ইকোনমিক জোনকে শুধু বড় বিনিয়োগকারীর জায়গা হিসেবে দেখা যাবে না। স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করতে হবে।
*পঞ্চমত*, পরিবেশগত মানদণ্ড কঠোরভাবে মানতে হবে। দ্বীপ জেলা ভোলায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, নদী ও মৎস্যসম্পদের সুরক্ষা কোনো দ্বিতীয় সারির বিষয় হতে পারে না।
*ষষ্ঠত*, ভোলার তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে আগাম বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন চোখের সামনে হবে, কিন্তু ভোলার মানুষ তার প্রধান সুফল পাবে না।
১২. *মানুষের জীবন বদলানোর অঙ্গীকার* :
ভোলায় ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুধু একটি শিল্পাঞ্চল গড়ার গল্প নয়। এটি এক জেলার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, সম্ভাবনা, নাগরিক সংগঠন, প্রশাসনিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিনিয়োগ–আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত গল্প। বিডিসির স্বপ্ন বুননের এই অধ্যায় দেখায়, উন্নয়ন কেবল ওপর থেকে নেমে আসে না; অনেক সময় তা নিচ থেকে দাবি, প্রস্তাব, তথ্য ও দৃঢ়তার মাধ্যমে ওপরে পৌঁছে যায়।
ভোলা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সিদ্ধান্ত সঠিক হলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন, কৃষি–প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য রপ্তানি, গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতি এবং নীল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। ভুল হলে এটি হতে পারে আরেকটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প, যেখানে জমি বদলাবে, সাইনবোর্ড উঠবে, কিন্তু মানুষের জীবন খুব বেশি বদলাবে না।
বিডিসির দায়িত্ব তাই এখানেই শেষ নয়। বরং এখন শুরু নাগরিক নজরদারির নতুন অধ্যায়। ভোলার উন্নয়ন যেন ভোলার মানুষের উন্নয়ন হয়, ভোলার গ্যাস যেন ভোলার কর্মসংস্থানে লাগে, ভোলার নদী যেন ভোলার জীবনধারাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং ভোলার তরুণেরা যেন নিজেদের জেলার শিল্পায়নে মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা পায়, এই দাবিই হতে হবে আগামী দিনের কেন্দ্রীয় কথা।
ইকোনমিক জোন ভোলার জন্য একটি সুযোগ। কিন্তু সুযোগ নিজে নিজে সাফল্যে পরিণত হয় না। সাফল্য আসে পরিকল্পনা, সততা, স্বচ্ছতা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।
বিডিসি যে স্বপ্ন বুনেছে, তা এখন বাস্তবতার পরীক্ষায়। সেই পরীক্ষায় পাস করতে হলে ভোলাকে শুধু মানচিত্রে একটি দ্বীপ জেলা হিসেবে নয়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে দেখতে হবে। আর সেই দেখার কাজটি শুরু হয়েছিল কিছু মানুষের বৈঠক, কিছু মানচিত্র, কিছু চিঠি, কিছু দৃঢ় যুক্তি এবং ভোলাকে এগিয়ে নেওয়ার এক অবিচল ইচ্ছা থেকে।