
নিউজ করার কারণে প্রতিবেদককের অফিসে এসে হত্যা ও লাশ গুমের হুমকি দিয়ে গেলেন ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ভবন মালিক
নার্গিস রুবি: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মোবাইল কোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে নকশা বহির্ভূত অংশ পুনরায় নির্মাণ করার অভিযোগে মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের একটি আবাসিক প্লটের মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে রাজউক। সংস্থাটি ওই প্লটের সকল ধরনের নির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং ব্যর্থতায় আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে এই ঘটনায় আরও একটি গুরুতর বিষয় সামনে এসেছে যা সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে প্রতিবেদকের ওপর চরম নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ তুলেছে। প্লট নং ৩৪, রোড নং এন-৫, ব্লক- এইচ, ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় পর্ব, মিরপুর, ঢাকায় অবস্থিত ওই ভবনের মালিক কাউসার শশুর প্রতিবেদককে হুমকি দিয়ে গেছেন যে, বিষয়টি নিয়ে নিউজ করলে বা বাড়াবাড়ি করলে তিনি প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দেবেন। তিনি আরও হুমকি দেন যে, দলীয় সন্ত্রাসী লোক দিয়ে পথে ঘাটে চলাফেরার সময় প্রতিবেদককে অপহরণ করে হত্যা করবেন এবং লাশ গুম করে ফেলবেন। সেটা না পারলে ডিবি পুলিশ বা র্যাব দিয়ে গ্রেফতার করাবেন এবং সারাজীবনের জন্য সাংবাদিকতা করা ও নিউজ করার স্বাদ মিটিয়ে দেবেন বলে প্রতিবেদককে জানিয়ে দিয়ে গেছেন। এই হুমকির ঘটনা রাজধানীতে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, প্লট নং ৩৪, রোড নং এন-৫, ব্লক- এইচ, ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় পর্ব, মিরপুর, ঢাকায় অবস্থিত ইমারতটির নির্মাণ কাজ চলমান ছিল। রাজউক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ কাজ করায় গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সংস্থাটি ওই প্লটে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ইমারতের নকশা বহির্ভূত আংশিক অংশ ভেঙ্গে অপসারণ করে। একই সাথে অবশিষ্ট ব্যত্যয়কৃত অংশ নিজ দায়িত্বে অপসারণ করবেন মর্মে প্লট মালিককে অঙ্গীকারনামা প্রদান করতে বলা হয়। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্লট মালিক কাউসার নকশা বহির্ভূত অংশ অপসারণ না করে উল্টো পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। এ অপরাধে ভবন মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের জন্য মামলা দায়ের করেনি রাজউক।
রাজউকের ১০ জুন ২০২৬ তারিখের নোটিশে এ ধরনের কার্যক্রমকে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাজউক প্লট মালিককে প্রশ্ন করেছে যে, নির্মিত ও নির্মাণাধীন ইমারতের ব্যত্যয়কৃত অংশ সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে অপসারণ না করে কেন পুনরায় নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে লিখিতভাবে কারণ দর্শাতে নোটিশে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই ইমারতের সকল ধরনের নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্যও বলা হয়েছে। রাজউক সতর্ক করে দিয়েছে, নির্দেশনা অনুসরণে ব্যর্থ হলে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিষয়টি আইনি দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো ইমারত নির্মাণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। একই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এছাড়া মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় এই আইনের অধীনে অপরাধগুলো মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও বিচার্য। অর্থাৎ রাজউক মাঠ পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে এ আইনের ভিত্তিতে।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্প্রতি সরকার দীর্ঘ সাত দশকের পুরনো টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩ রহিত করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করেছে। নতুন এই অধ্যাদেশে নকশা বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাথে কৌশলগত পরিকল্পনা বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা জরিমানা এবং ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ করলে তিনি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া অধ্যাদেশে রাজউকের কোনো কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজে সহায়তা করেন বা জেনেও নিরব থাকেন, তবে তাকেও দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা ভোগ করতে হবে বলে বিধান করা হয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে রাজউক এলাকায় নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত ৩ হাজার ৩৮২টি নির্মাণাধীন ভবন চিহ্নিত করেছে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে অবৈধ ভবনগুলোর ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, ফৌজদারি মামলা দায়ের করা, নকশা বাতিল করা এবং প্রয়োজনে ভবন সিলগালা করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান আরও জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাজধানীতে নকশা বহির্ভূত ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ইমারত নির্মাণের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবনের একটি বড় অংশ নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পল্লবী এলাকায় প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভবন, রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকায় প্রায় ৯৭ শতাংশ ভবন এবং ধানমন্ডি এলাকায় প্রায় ৮৯ শতাংশ ভবন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। এমনকি ১০ তলার ওপর ১ হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে ৮৪ শতাংশই নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে রাজউকের জরিপে প্রমাণিত হয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া এবং পরবর্তীকালে এর ওপর নজর রাখার দায়িত্ব সরকারের একাধিক বিভাগের ওপর বর্তায়। কিন্তু ভবন মালিকরা ইমারত বিধিমালা মানছেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিধিমালা না মানলেও নির্মাণের অনুমতি মিলছে সহজেই বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি মনে করেন, রাজউক তার কোর নিয়ন্ত্রণকারী দায়িত্বের চেয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো সংস্কার না করলে আইন পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যেহেতু রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, তাই অনেক সরকারি ভবনও আইনত অবৈধ। এটা অবশ্যই একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। তিনি মনে করেন, রাজউকের তদারকির অভাব ও অস্বচ্ছতার কারণেই অনুমোদনহীন বা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা ভবনগুলোর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ঘটনায় রাজউক যে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে, তা মোবাইল কোর্টের নির্দেশনা অমান্যের একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙ্গে দেওয়ার পরও পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু করা হলে তা আইনের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের ঘটনায় রাজউকের কারণ দর্শানোর নোটিশ ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রাজউক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধ নির্মাণ ভেঙ্গে দিলেও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একই কাজ পুনরায় শুরু করতে থাকেন। এদিকে ভবন মালিক কাউসারের প্রতিবেদককে হত্যা, লাশ গুম এবং ফৌজদারি মামলার হুমকি বিষয়টি আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। এ ধরনের হুমকি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন অধ্যাদেশে রাজউকের কর্মকর্তাদের অসাধু আচরণের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান যুক্ত করায় এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখায় আশা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কমে আসবে। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়, এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ঘটনায় রাজউক যে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, সেই সময়ের মধ্যে প্লট মালিক কারণ দর্শাতে ব্যর্থ হলে বা সন্তোষজনক উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে রাজউকের হাতে এখন নতুন অধ্যাদেশের আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা প্রয়োগ করে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করা সম্ভব বলে আইনজীবীরা মনে করছেন। পাশাপাশি প্রতিবেদককে দেওয়া হুমকির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংবাদকর্মীরা।