
এ এইচ মোবারকঃ
২১ এপ্রিল, ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এম. আর. মাহবুব-এর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৬৯ সালের ১৫ অক্টোবর নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার চর আহম্মদপুরে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন জিজ্ঞাসু, অনুসন্ধিৎসু এবং ইতিহাস-সচেতন একজন মানুষ, যা পরবর্তীতে তাঁকে গবেষণার জগতে নিয়ে আসে।
তিনি ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের সূচনা করেন সাংবাদিকতার মাধ্যমে। সংবাদপত্রে কাজ করার সময় থেকেই সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা অজানা দিক তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীতে তিনি কিছু সময় অধ্যাপনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, যেখানে নতুন প্রজন্মের কাছে জ্ঞান বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং জাতির ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি আত্মনিয়োগ করেন ভাষা-আন্দোলন গবেষণায়। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একনিষ্ঠ ও শেকড়সন্ধানী গবেষক। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, দলিল অনুসন্ধান এবং প্রামাণ্য উপকরণ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেছেন গবেষণার এক দৃঢ় ভিত্তি।
তাঁর রচিত ভাষাসৈনিকদের জীবনী ও ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসভিত্তিক অন্তত ১৬টি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব গ্রন্থে উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলনের বহু অজানা, অপ্রকাশিত ও অশ্রুত ইতিহাস—যা শুধু পাঠকসমাজই নয়, গবেষক মহলেও বিশেষভাবে সমাদৃত। একই বিষয়ে তাঁর আরও বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভাষা-আন্দোলন গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
ভাষা-আন্দোলনকে বৃহৎ ক্যানভাসে তুলে ধরার লক্ষ্যে তিনি সংগ্রহ করেছেন অসংখ্য দুর্লভ দলিল, অপ্রকাশিত আলোকচিত্র এবং স্মারক নিদর্শন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় উদ্ধার হয়েছে বহু ভাষাসংগ্রামীর গৌরবময় অবদানের স্মৃতিকথা, যা হয়তো ইতিহাসের আড়ালেই থেকে যেত। তিনি শুধু গবেষকই নন, ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রাহক ও সংরক্ষণকর্মী।
ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই গবেষণা-যাত্রা দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা, লেখা ও গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন—যা তাঁর জ্ঞানপিপাসু মনন ও দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল প্রমাণ।
তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। কর্মসূত্রে তিনি ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির সদস্য ছিলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি। তাঁর গবেষণা, চিন্তা ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে—এই প্রত্যাশা রইল। মহান আল্লাহ্ তাঁর সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন।