শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ন
*১। প্রেক্ষাপট*
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও এর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মন্থরতা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানা বন্ধের ঘটনা এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
*২। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে উদ্বেগ*
২০২৫ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৮.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৪১ শতাংশ কমেছে। এ প্রবণতা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
*৩। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ*
চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়া প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো সাধারণ পোশাক উৎপাদনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
*৪। কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকি*
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪০০টিরও বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংকঋণের সুদ, জ্বালানি সংকট ও ক্রয়াদেশের ঘাটতি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
*৫। শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি*
৪ নভেম্বর ২০২৬-এর রয়টার্স প্রতিবেদনে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি উঠে এসেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও প্রয়োজন। অন্যথায় আন্তর্জাতিক ইউরোপীয় বজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।
*৬। বাজার ও বাণিজ্যিক সুবিধার ঝুঁকি*
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রধান@ বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত EBA সুবিধা ভবিষ্যতে ধরে রাখতে শ্রম অধিকার, কর্মপরিবেশ ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
*৭। প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা*
বিশ্বের পোশাকশিল্প দ্রুত অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
*৮। উত্তরণের কৌশল*
এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন—
(১) ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান।
(২) উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ।
(৩) শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
(৪) অটোমেশন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি।
(৫) ব্যাংকঋণ, জ্বালানি ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার।
(৬) আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে বিশেষ উদ্যোগ।
*৯। শিল্পের সুরক্ষা ও আধুনিকায়ন*
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকেতকে সাধারণ ব্যবসায়িক মন্দা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক বাজারে অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়। প্রতিযোগী দেশগুলো যখন প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়নের পথে এগোতে হবে।
অশনিসংকেত ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই এ শিল্পের সুরক্ষা ও আধুনিকায়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত করা জরুরি।
*( লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন পেশাদার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক)*