বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১২ অপরাহ্ন

শিরোনাম
মাগুরায় জেলা পর্যায়ে ৩ দিনব্যাপী জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন মাগুরার খামারপাড়া এস এ আই সিনিয়র মাদ্রাসায় বিদায় সংর্বধণা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত মাগুরায় সুমন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন! বিস্তারিত জানালেন পুলিশ সুপার মাগুরায় লক্ষাধিক শিশুকে হাম রুবেলার টিকা দেয়া হবে ইরানে ট্রাম্পের নৌ-অবরোধের ব্যর্থতা ও ইসলামাবাদে নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়* *—-অধ্যাপক এম এ বার্ণিক* মাগুরায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন মাগুরার শ্রীপুরে জামায়াতে ইসলামীর দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত যুবদল নেতা ফয়েজ মোল্লার, ঢামেকে খোঁজ নিলেন ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকন এমপি বাংলাদেশের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল একুশে টিভি’র ২৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সুশীল ফোরামের শুভেচ্ছা In Reverence and Remembrance ‘Abdul Hye—Professor M A Barnik

আয়নাঘর: রাষ্ট্রীয় বর্বরতার প্রতীক এবং অপব্যবহারকারীদের দায়হীনতার কাহিনি— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সংবাদদাতা / ১১৮ বার ভিউ
সময়ঃ বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১২ অপরাহ্ন

১. জেআইসি’র অপর নাম আয়নাঘর :

বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘আয়নাঘর’ নামটির সঙ্গে জড়িত নির্যাতনের নৈরাজ্য, একটি চলমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটের প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো একক সরকারই এই ভয়াবহ প্রক্রিয়ার বিষয়সন্ধির বাইরে নয় — বরং প্রতিটি শাসক দল তাদের ক্ষমতায় থাকাকালীন এটি বজায় রেখেছে বা অপব্যবহার করেছে।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (JIC) প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাকে নির্যাতিতরা নাম দিয়েছেন আয়নাঘর। এ কেন্দ্রটি কোনো আইনগত ভিত্তি ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছিল।
২. আয়নাঘরের শুরুটা জিয়ার হাতে :
শেখ হাসিনার লেখা ‘বাংলাদেশের —স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’ নামক বইতে লেখা আছে যে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কিভাবে ডিজিএফআইয়ের ব্যবহার করেছেন।বিশেষ করে ১৯৭৭–৭৮ সালে বিএনপি গঠনের প্রাক্কালে, জিয়াউর রহমান আয়নাঘর তৈরি করেন সশস্ত্রবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-কে অনৈতিক কাজে ব্যবহারের জন্য। তখন থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সন্দেহভাজনদের আটক ও নির্যাতনের কাজে আয়নাঘরের ব্যবহার শুরু হয়।
৩. জিয়ার সময়ের একটি আলোচিত ঘটনা :
জিয়ার সময়ে একটি আলোচিত ঘটনা ছিল আওরঙ্গ নামক ব্যক্তিকে নিয়ে। জিয়ার নির্দেশে ডিজিএফআই তাকে আয়নাঘরে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু প্রতিরোধের মুখে ডিজিএফআইয়ের এক সদস্য নিহত হন। এই হত্যাককণ্ডের বিচারের জন্য আদলতে মামলা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালত আওরঙ্গকে অব্যাহতি দেন, কারণ, ডিজিএফআই প্রমাণ করতে পারেনি যে, তারা কোন আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল।
৪. খালেদা জিয়ার শাসনামলে আবার আওরঙ্গ খেলা :
পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার শাসনামলে ডিজিএফআইকেই আবার ব্যবহার করে আওরঙ্গকে আয়নাঘরে আনা হয়। আগেরবার জিয়া ব্যর্থ হলেও এবার খালেদা সফল হন, এবং আওরঙ্গ বিএনপিতে যোগ দিয়ে শরীয়তপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এটি আয়নাঘরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধারাবাহিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এক বাস্তব উদাহরণ।

৫. এরশাদের আমলে জাতীয় পার্টি গঠনে আয়নাঘরের ব্যবহার :

সেনাশাসক এরশাদ ১৯৮০-এর দশকে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। তাঁর নেতৃত্বে আয়নাঘর ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকে বন্দি রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে দলভুক্ত করা হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই নির্যাতনের পর ‘বশ্যতা স্বীকার’ করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। এটি ছিল একপ্রকার রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ, যেটি ভয় ও নিপীড়নের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল।

৬.আয়নাঘরে কাস্টমস অফিসার রউফের হত্যা:

১৯৮০-এর দশকে কাস্টমস অফিসার রউফকে আয়নাঘরে আটক রেখে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা গোপন হত্যাকাণ্ড, যার নেপথ্যে ছিল ক্ষমতা প্রদর্শনের নির্মম রাজনৈতিক কৌশল। উক্ত হত্যা মামলায় ডিজিএফআইয়ের স্থানাপন্ন ডিজি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির অভিযুক্ত হলেও, এরশাদ তাকে রক্ষা করেন।

৭. শেখ হাসিনার আমলে আয়নাঘরের সর্বাধিক ব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা:

শেখ হাসিনা জানতেন আয়নাঘর ও ডিজিএফআই কীভাবে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হয় — কারণ তিনি তার লেখা “বাংলাদেশ—স্বৈরতন্ত্রের জন্ম” নামক বইতে জিয়াউর রহমান কিভাবে ডিজিএফআইয়ের অপব্যবহারের করেছেন, তা সবিস্তারে আলোচন করেছেন। তাই ক্ষমতায় এসে তিনিই একই পদ্ধতিকে আরও ভয়ংকর রূপ দেন। বিএনপি থেকে এস এ খালেককে আওয়ামী লীগে আনার জন্য ডিজিএফআইয়ের ব্যবহার দিয়ে শেখ হাসিনার যাত্রা শুর হয়। এসময় ডিজিএফআইয়ের ডিজি ছিলেন মেজর জেনারেল মজরুল ইসলাম।
পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নির্দেশে ফ্রিডম পার্টির নেতাদের বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় জড়াতে আয়নাঘরের মাধ্যমে ধরে এনে নির্যাতন করা হয়।

জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জড়াতে একইভাবে গোপন আটকের পর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে ডিজিএফআই ব্যবহার করা হয়। তাঁর বাসা নজরদারি, পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানো এবং পাসপোর্ট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্লক করাও এই প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। এসময় ডিজিএফআইয়ের ডিজি ছিলেন মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন। বিচারপতি সিনহা এসব বিষয় নিয়ে বই লিখেছেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজমী, কর্নেল মহিউদ্দিন, ইলিয়াস আলী এবং অসংখ্য বিএনপি-জামায়াত সমর্থককে আয়নাঘরে তুলে নিয়ে গুম, দীর্ঘদিন আটক এবং নির্যাতনের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

ইসলামি ধর্মীয় নেতাদের উপর এক বিশেষ রাজনৈতিক অভিযান চালানো হয়। বহু আলেম-ওলামাকে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে আয়নাঘরে বন্দি রেখে নির্মম নির্যাতন করা হয় — যা আসলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইসলামকে দমন করার একটি কৌশল ছিল।

 

 

৮. ডিজিএফআই ও আয়নাঘর নির্যাতনের উপর ভিত্তি করে প্রকাশিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই:

আয়নাঘর ও ডিজিএফআই নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন ভুক্তভোগী, বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের রচনায়। উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো—

“মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরতন্ত্র” — ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ

“গণতন্ত্রের সংগ্রামে আমার জীবন” — অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন

“এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল’ অ্যান্ড ডেমোক্রেসি” (A Broken Dream: Rule of Law and Democracy) — বিচারপতি এস কে সিনহা

“স্মৃতি, সংগ্রাম ও রাজনীতি” — অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ

এই বইগুলোতে বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক বন্দিত্ব, গোপন জিজ্ঞাসাবাদ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো আয়নাঘরের ইতিহাস চিহ্নিত করতে প্রামাণ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত।

৯. মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ:

২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অন্তত ১,০৪৮ জন ব্যক্তি হেফাজতে “কাস্টডি ডেথ” কিংবা গোপনে আটক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন, এবং ৬৭৭ জনকে “বাধ্যতামূলক গায়েব” (enforced disappearance) হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারের কাছে একাধিকবার জবাবদিহির দাবি জানায়।

 

১০. কেন দরকার অভিযোগভিত্তিক তদন্ত:

এই ভয়াবহ ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়, আয়নাঘর শুধুই একটি ভবন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতীক। এই কাঠামোর পেছনে যাঁরা দায়ী, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হলে প্রয়োজন—

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় তদন্ত কমিশন, যা আয়নাঘর সংক্রান্ত সব অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি, চিকিৎসা প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে।

আইনি দায়বদ্ধতা ও বিচার, যাতে আয়নাঘরের নির্মাতা, ব্যবহাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের — অর্থাৎ জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার — ভূমিকা মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়।

১১. আয়নাঘর সমূলে ধ্বংস করতে হবে:

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়। অতএব আয়নাঘরের মতো অপরাধ কাঠামোকে শুধু বিলুপ্ত করাই নয়, এর পেছনের অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তবেই ‘আয়নাঘর’ শব্দটি ইতিহাসে থাকবে — প্রতিরোধ ও মুক্তির এক নীরব স্বাক্ষী হিসেবে, বর্বরতার প্রতীক হিসেবে নয়।

——–====———


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


[prayer_time pt="on" sc="on"]