বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
১. নীরবতার শব্দে বিভোর নির্বাচন কমিশন*:
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রায় নির্বাচন কমিশন হওয়ার কথা একটি নিরপেক্ষ বাতিঘর—যার আলোয় পথ হারানো রাজনীতি দিকনির্দেশ পায়। কিন্তু সেই বাতিঘর যখন নিজেই কুয়াশায় ঢেকে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এ আলো কি সকলের জন্য সমান? নাকি কিছু মুখের জন্য বিশেষভাবে উজ্জ্বল, আর বাকিদের জন্য নিভু নিভু?
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আজ সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আইন ও সংবিধানের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিএনপির একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ অমীমাংসিত রেখেই নির্বাচনের পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নীরব সিদ্ধান্তই আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে উচ্চকিত শব্দ।
*২.আইনের কাঠামো বনাম কমিশনের মনোভাব*:
সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে শুধু ক্ষমতা দেয়নি, দিয়েছে দায়িত্ব—
দায়িত্ব দিয়েছে সমান আচরণ, যাচাইযোগ্য স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিএনপির সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ছাড়াই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
এটি কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; বরং এটি হয়ে উঠছে এক ধরনের নির্বাচনী নৈতিকতার আত্মবিসর্জন।
আইনের চোখ যেখানে অন্ধ হওয়ার কথা, সেখানে কমিশনের দৃষ্টি যেন একপেশে—একদিকে তীক্ষ্ণ, অন্যদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা।
*৩. NCP ও জামায়াতে ইসলামির আপত্তি: চাপা আগ্নেয়গিরি*:
এই অমীমাংসিত অবস্থার বিরুদ্ধে NCP ও জামায়াতে ইসলামি শুধু প্রশ্ন তুলেই থেমে থাকেনি; তারা একে নির্বাচনী বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।
এই হুমকি নিছক রাজনৈতিক ভাষণ নয়—এ যেন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে জমে ওঠা চাপা আগ্নেয়গিরির গর্জন।
কারণ, যখন নির্বাচন কমিশন কোনো একটি দলের ক্ষেত্রে অভিযোগ নিষ্পত্তি ছাড়াই ছাড়পত্র দেয়, তখন অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে সেটি স্পষ্ট বার্তা হয়ে দাঁড়ায়—
খেলার মাঠ সমান নয়।
*৪. পক্ষপাতের অভিযোগ উপেক্ষা*:
নির্বাচন কমিশন যদি সচেতনভাবে এই অভিযোগগুলো অমীমাংসিত রেখে নির্বাচন করে, তবে তার রাজনৈতিক অর্থ একটাই—
বিএনপির প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন।
এই পক্ষপাত কোনো লিখিত ঘোষণায় নয়, বরং কমিশনের নিষ্ক্রিয়তায় প্রকাশ পাচ্ছে।
কখনো কখনো সিদ্ধান্ত না নেওয়াই সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে—আর সেটিই আজ ঘটছে।
একটি স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থায় যেখানে সামান্য ত্রুটিতেও প্রার্থিতা বাতিল হয়, সেখানে গুরুতর অভিযোগ ঝুলে রেখেই নির্বাচন আয়োজন করা মানে হলো—
আইনের বদলে কৌশলকে প্রাধান্য দেওয়া।
*৫. ভবিষ্যতের অশনিসংকেত*:
ইতিহাস সাক্ষী—বাংলাদেশে বিতর্কিত নির্বাচন কখনোই শুধু একটি দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর রেশ পড়ে রাজপথে, আদালতে, এমনকি রাষ্ট্রের বৈধতার প্রশ্নে।
নির্বাচন কমিশনের এই একরোখা মনোভাব পরিস্থিতিকে যে-কোনো সময় অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে—
যেখানে নির্বাচন আর উৎসব থাকবে না, হয়ে উঠবে সংঘাতের উপলক্ষ।
আজ যদি অভিযোগ নিষ্পত্তি না হয়, আগামীকাল ফলাফলও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আর প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফল মানেই একটি অস্থির রাষ্ট্র।
*৭. কঠিন দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার পরিণতি*:
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখনও সময় আছে—
সময় আছে আইনকে প্রাধান্য দেওয়ার,
সময় আছে নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেওয়ার,
সময় আছে ইতিহাসের কাঠগড়ায় নিজেকে অভিযুক্ত না করার।
নচেৎ, এই নির্বাচন স্মরণীয় হবে ভোটের সংখ্যার জন্য নয়—
স্মরণীয় হবে অমীমাংসিত অভিযোগের বোঝা বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়ে।
রাষ্ট্রের গণতন্ত্র আজ অপেক্ষায়—
কমিশন কি আইন মানবে,
নাকি কৌশলের পথেই হেঁটে ইতিহাসের আরেকটি অন্ধ অধ্যায় রচনা করবে?