বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন
মোঃ সাইফুল্লাহ, মাগুরা প্রতিনিধি ঃ
প্রায় দেড় কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও তসরুপের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আট মাস পেরিয়ে গেলেও মাগুরা আদর্শ কলেজের অপসারিত অধ্যক্ষ শ্যামল কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বিস্ময়করভাবে তার বেতন-ভাতা নিয়মিত উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে—যা পুরো ঘটনাকে ঘিরে গভীর প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
নতুন করে সামনে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। কলেজ সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বরং ওই অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে পুনর্বহালের জন্য সক্রিয়ভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তসরুপকৃত অর্থ ফেরত না দিয়ে তারই একটি অংশ এই গোষ্ঠীর পেছনে ‘বিনিয়োগ’ করা হয়েছে—যা পুরো ঘটনাকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। তসরুপকৃত দেড় কোটি টাকার অংশ ভোগের অভিপ্রায়েই কি শ্যামল কুমারকে পুনর্বহালের চেষ্টা—এ প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর থেকেই শ্যামল কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার ফি ও উন্নয়ন তহবিলসহ বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির তদন্তে প্রায় দেড় কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ মেলে।
অডিট সূত্রে জানা যায়, স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮০৯ টাকার বিপরীতে ব্যাংকে জমা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১ লাখ ৮০ হাজার ৩০০ টাকা। বাকি প্রায় ৭৩ লাখ টাকার কোনো হদিস নেই।
একইভাবে, উচ্চ মাধ্যমিক, বিএমটি ও স্নাতক (পাস) শাখার বিভিন্ন ফি বাবদ আদায়কৃত ১ কোটি ৪২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা হয়েছে মাত্র ৯৮ লাখ ৯৪ হাজার ২৩০ টাকা। প্রায় ৪৩ লাখ টাকার কোনো হিসাব মেলেনি।
কলেজ মার্কেটের দোকান ভাড়া, লিজ ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে আরও লাখ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। এমনকি কোনো অনুমোদন ছাড়াই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়া হলেও তা রহস্যজনকভাবে দীর্ঘ আট মাস গোপন রাখা হয়। পরে চাপের মুখে অধ্যক্ষকে দায়িত্ব থেকে সরানো হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং এখন তাকে পুনর্বহালের অপচেষ্টা চলছে—যা প্রশ্ন তুলেছে, কোন স্বার্থে এই পুনর্বহাল?
এত বিপুল আর্থিক অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও অভিযুক্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া এবং তার বেতন চালু রাখার ঘটনা স্থানীয়দের কাছে রহস্যজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির আহ্বায়ক সহকারী অধ্যাপক মো. কবিরুল বাশার দাবি করেন, নিরপেক্ষভাবেই তদন্ত করা হয়েছে এবং অনিয়মের প্রমাণ স্পষ্ট। তবে কেন এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কলেজ প্রশাসন তারাই বলতে পারবেন।
এদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গোলাম কাবিয়ার ভাষ্য, আর্থিক দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও অভিযুক্তকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়নি, এমনকি তার বেতন বন্ধের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। ফলে নিয়মিতভাবেই তার নামে বেতন-ভাতা চলমান রয়েছে।
সব মিলিয়ে মাগুরা আদর্শ কলেজে দেড় কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ এখন আর শুধু আর্থিক কেলেঙ্কারিতে সীমাবদ্ধ নেই—এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আর্থিক লাভালাভের প্রশ্ন।
এ বিষয়ে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এড শাহেদ হাসান টগর বলেন, কলেজের অভ্যন্তরীণ এবং জেলা প্রশাসকের তদন্তে আর্থিক দূর্ণীতির অভিযোগ উঠে আসলেও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে কলেজ পরিচালনা কমিটির পরবর্তি সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মোঃ সাইফুল্লাহ, মাগুরা।
/০১/৭/২০২৬ইং