বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
১৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাক–এর প্রথম পৃষ্ঠায় ফরহাদ মাজহার এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে সতর্ক করেছেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি “সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব” সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এই প্রতিবিপ্লবের লক্ষ্য হলো, জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করা এবং জনগণের বিজয়কে রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা। মাজহারের ভাষায়,
> “ড. ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার কোনো বৈধ অধিকার নেই… তিনি গণ-অভ্যুত্থানের নেতা নন, তিনি গণ-অভ্যুত্থানের ফলমাত্র। আমাদের গণ-অভ্যুত্থান যদি ব্যর্থ হয়, সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবে যদি আমাদের প্রতারিত করা হয়, তাহলে আমরা আবারও গণ-অভ্যুত্থান ঘটাব।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ আগস্ট ২০২৫)

এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়; এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামো ও ক্ষমতার প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনার এক ঐতিহাসিক চেষ্টা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের পর দেখা গেল, একটি সংগঠিত শক্তি সাংবিধানিক ফাঁদ ব্যবহার করে সেই পরিবর্তনকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে। বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার :
১. প্রতিবিপ্লবের কৌশল
ফরহাদ মাজহারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই প্রতিবিপ্লবের কৌশল ছিল বহুমাত্রিক:
(১). গণনেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করা – আন্দোলনের নেতৃত্বকে প্রান্তিক বা অকার্যকর করা।
(২). আইনি ও সাংবিধানিক ফাঁদ – সংবিধানের ধারা ও আদালতের রায় ব্যবহার করে পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখা।
(৩). বিদেশি প্রভাব – বিশেষ করে ভারতের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহৃত হয়ে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ সুগম করা।
(৪). অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ – অর্থপাচার ও কর্পোরেট লবির মাধ্যমে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর আর্থিক সহায়তা সীমিত করা।
(৫). পুরনো শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা – গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত শক্তিকে ভিন্ন রূপে ফেরানো।
২. ফ্যাসিস্ট সংবিধান অধীনে ড. ইউনূসের শপথ গ্রহণ
মাজহার সতর্ক করেছেন,
> “শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সংবিধানের অধীনে যখন শপথ বা সরকার গঠন হয়েছে… তখন আপনি… রাষ্ট্রটা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন… সাংবিধানিক একটা প্রতিবিপ্লব ঘটেছে।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ আগস্ট ২০২৫)
৩. ইতিহাসের প্রমাণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধানের আড়ালে আটকে দিয়ে পুরনো স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ১৯৭৫ সালের পর সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামোর অপব্যবহার সেই ঘটনার উদাহরণ। এছাড়া, বিশ্ব ইতিহাসেও দেখা যায়—ফরাসি বিপ্লবের পর নেপোলিয়ন বা আরব বসন্তের পর স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবর্তন—সবখানে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে রাজনৈতিক কৌশলে ধ্বংস করা হয়েছে।
৪. আমার দৃষ্টিভঙ্গি
ফরহাদ মাজহারের বিশ্লেষণ ও সতর্কবার্তা আমি সম্পূর্ণ সমর্থন করি। কারণ:
(১). গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়; এটি ছিল ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন ও রাজনৈতিক বহুমতের প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
(২). সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হলে আন্দোলনের চেতনা বিকৃত হয় এবং জনগণের বিজয় হুমকির মুখে পড়ে।
(৩). গণনেতৃত্বের ঐক্য, সংবিধান সংস্কার এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া স্বাধীন ও স্থায়ী গণতন্ত্র নিশ্চিত করা যায় না।
৫. সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া
সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব এক নীরব, কিন্তু মারাত্মক প্রক্রিয়া। এটি ট্যাঙ্ক–গোলার গর্জন ছাড়া জনগণের অর্জনকে ধ্বংস করতে পারে। ফরহাদ মাজহারের সতর্কবার্তা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সংরক্ষণ করতে হবে, সংবিধান ও আইনকে জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে, এবং রাজনৈতিক সততা ও সাহসী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
যদি আমরা এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দিই, তবে ইতিহাসে আবারও লেখা হবে—জনগণ লড়েছিল, ত্যাগ স্বীকার করেছিল, কিন্তু বিজয় কেবলই অন্যের হাতে গিয়েছে। গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব আমাদের হাতে।
৬. ড. ইউনূসের ভূমিকা ও নির্বাচনের প্রভাব
ড. ইউনূসের ভূমিকা এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সংস্কার এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা লক্ষ্যচ্যুত করতে চেষ্টা করেছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচনের নামে শাসন কাঠামোতে পরিবর্তন সীমিত রাখার মাধ্যমে আন্দোলনের মূল চেতনা—জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিবর্তন—নষ্ট করা হচ্ছে। অর্থাৎ, নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যকর গণতন্ত্রের পরিবর্তে কেবল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত লক্ষ্যকে বিকৃত করছে।
৭. গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দের কর্তব্য
গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দের প্রধান দায়িত্ব হলো আন্দোলনের মূল চেতনা বাস্তবায়ন করা। তাঁরা অবশ্যই:
(১). নির্বাচনের চাপ বা ক্ষমতালিপ্সার কারণে আন্দোলনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবেন না।
(২). গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের অধিকার রক্ষা করবেন।
(৩). নেতৃত্বের ঐক্য বজায় রাখবেন, ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন না।
(৪). আন্দোলনের স্বচ্ছতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন।
(৫). রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা মোকাবেলা করে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগী হবেন।
এই দায়িত্ব পালন করলে গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষিত থাকবে এবং সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।