শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন
১. ইতিহাসের আঙিনায় সহোদরের মতো জন্ম :
লালমনিরহাটের পুরান বাজার—যেন ইতিহাসের আঁচলে গেঁথে রাখা এক শান্তির ফুল। ১৮৩৬ সালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কালীবাড়ি মন্দির। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি তখন বাজারের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত প্রতিদিন ভোরে আর সন্ধ্যায়। প্রায় আশি বছর পরে, ১৯১৫ সালে জন্ম নেয় আরেক প্রতিবেশী—নামাজঘর, যা ধীরে ধীরে পরিণত হয় পুরান বাজার জামে মসজিদে।
এ যেন দুই সহোদরের জন্ম—একজন হিন্দু, আরেকজন মুসলমান; দুজনেরই শিকড় একই মাটিতে, শ্বাস একই বাতাসে।
২. বাবরির ঝড়েও অটল শান্তি পূজারি-নামাজির দৃষ্টান্ত :
১৯৯২ সালের অযোধ্যা। বাবরি মসজিদ ভাঙার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে। চারদিকে উত্তেজনার আগুন। কিন্তু লালমনিরহাটের এই ছোট্ট প্রাঙ্গণে তখনো শান্তির বীণায় বাজছিল মধুর সুর।
স্থানীয় বৃদ্ধ রমেশ চন্দ্র দাস তখনকার ঘটনা স্মরণ করে বলেন—
“চারপাশে ঝড় উঠলেও আমাদের বাজারে একটুও ধুলো পড়েনি। আমরা পূজা করেছি, তারা নামাজ পড়েছে। ভাই ভাই হয়ে ছিলাম।”
এ যেন ঝড়ের ভেতরেও অটল শালগাছ—অটল সম্প্রীতি, অবিচল ভালোবাসা।
৩. আজান ও ঘণ্টার মিলিত সুর :
বাজারের দুপুর মানেই দ্বৈত সংগীত। একদিকে মসজিদের মিনার থেকে ধ্বনিত হয় আজান—
“হায়া আলাস সালাহ, হায়া আলাল ফালাহ…”
অন্যদিকে মন্দির থেকে বাজতে থাকে ঘণ্টা ও শঙ্খ।
একজন মুসুল্ল আব্দুল করিমের কণ্ঠে এক সহজ সত্য—
“আজান হলে পূজা থেমে যায় না, পূজা হলে নামাজও বাধাগ্রস্ত হয় না। আমরা বিশ্বাস করি—সম্মান আর ভালোবাসা থাকলেই আল্লাহ-ভগবান উভয়েই খুশি হন।”
এ যেন ভিন্ন সুরের যন্ত্র একসাথে বাজিয়ে এক অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করা।
৪. উপমার বাগানে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি :
পুরান বাজার আসলে এক বাগান, যেখানে পাশাপাশি ফুটে থাকে শিউলি আর রজনীগন্ধা। কারও রঙ কম নয়, কারও গন্ধ কম নয়—তবুও দুজন মিলে বাগানকে করে তোলে সৌন্দর্যময়।
এখানকার মুসলমান ও হিন্দুর হৃদয় একই ছন্দে স্পন্দিত হয়। ধর্ম ভিন্ন হলেও মানুষের হাসি, দুঃখ, আনন্দ ও মিলন একই স্রোতে ভেসে যায়।
৫. সম্প্রীতি শেখার মিলন-মেলা :
পুরান বাজারের সহাবস্থান কেবল একটি স্থানীয় গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য এক মূল্যবান পাঠশালা। এই মাটির আসল শক্তি হলো সহনশীলতা, ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
আজান ও ঘণ্টাধ্বনির মিলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
👉 ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয় একই থাকে।
👉 বিশ্বাসের রূপ আলাদা, কিন্তু সম্প্রীতির আলো সবার জন্য সমান উজ্জ্বল।
৬. ধর্মীয় সহনশীলতার বাংলাদেশ :
লালমনিরহাটের পুরান বাজারে মসজিদ ও মন্দিরের সহাবস্থান যেন এক উপন্যাস—যেখানে প্রতিটি অধ্যায়ে লেখা আছে শান্তি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের কাহিনি। এই গল্প শুধু লালমনিরহাটের নয়, এটি বাংলাদেশের হৃদয়েরই প্রতিচ্ছবি।
৭. কুরআন ও পুরানের আমলে কি অপূর্ব মিল:
আল-কুরআন (১০৯: ৬) বলে, ” লাকুমদীনুকুম ওয়াল ইয়াদীন”, অর্থ : তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমাদের জন্য আমাদের ধর্ম।
অপরদিকে হিন্দু-পুরান যজুর্বেদ (৩৬:১৭) বলা হয়েছে,
“মিত্রস্য চাক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষন্তাম্”,
অর্থ: “সমস্ত সৃষ্টিজগৎ যেন
পরস্পরকে মিত্রের দৃষ্টিতে দেখে।”
এসব হলো কুরআন ও পুরানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্পষ্ট বিধান। যেমনটি লালমনিরহাটের একই বৃত্তে অবস্থিত মুসলিম ও হিন্দু সমাজের লোকেরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে দেখা যায়।