শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০০ পূর্বাহ্ন
১. প্রেক্ষাপট:
সম্প্রতি কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে— জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম-এর নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার প্রস্তাব বা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ভিডিও ও সংবাদচিত্রে দেখা গেছে— এসব শিক্ষক ফোরামের সদস্যরা তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে রয়েছেন, কখনো ভার্চুয়ালি, কখনো প্রকাশ্য সভায়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে— তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব গ্রহণ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করবে কি না?
২. সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো:
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী—
> “নির্বাচন কমিশন সমস্ত নির্বাচন পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করবে, এবং এই দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে।”
অন্যদিকে, ইন্টারিম বা আন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু দলীয় নয়, তাই তার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে “দলীয় আনুগত্যসম্পন্ন কর্মকর্তা বা শিক্ষক” নিয়োগ পাওয়া সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা এ ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ।
যদি নির্বাচন পরিচালনাকারীরা কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে প্রকাশ্যে যুক্ত থাকেন, তাহলে—
ভোটারদের আস্থা কমে যাবে,
প্রার্থীদের মধ্যে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হবে,
এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হবে।
৩. দলীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ ও নৈতিক সংকট:
বিভিন্ন পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের একাধিক নেতা সম্প্রতি তারেক রহমানের ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নিয়েছেন,
যেখানে তাঁরা বিএনপি ঘনিষ্ঠ অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
একই সঙ্গে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে “শিক্ষক সমাজের জাতীয় ঐক্য” নামে প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন, যার রাজনৈতিক দিক স্পষ্টভাবে দলীয়।
এই পরিস্থিতিতে, তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব গ্রহণ শুধু প্রশাসনিক নয়, নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।
৪. নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া:
নির্বাচন কমিশন যদি দলীয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়, তাহলে তা নিম্নলিখিত ফলাফল বয়ে আনতে পারে—
(১) নিরপেক্ষতার ধারণা ক্ষুণ্ন হবে;
(২) প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়বে;
(৩) নির্বাচনের পর ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
এক্ষেত্রে কমিশনের দায়িত্ব হবে নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দলীয় সম্পর্ক যাচাই করা এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া।
৫. আইনি বিশ্লেষণ:
নির্বাচনি আচরণবিধি (Election Conduct Rules, 2008) অনুযায়ী, কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি “দলীয় প্রচারে যুক্ত হন বা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করেন”, তবে তাঁকে নির্বাচন পরিচালনা থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা যায়।
অতএব, দলীয় শিক্ষক ফোরামের সদস্যদের নিয়োগ আইনের চোখে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) সৃষ্টি করবে।
৬. বাছাই কমিটির মাধ্যমে দলীয় লোক বাদ৷ দেয়ার প্রস্তাব :
আন্তর্বর্তী সরকার দলীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়ে দলীয় শিক্ষক বা কর্মচারীদের নিয়োগ থেকে বিরত থাকা উচিত।
নির্বাচন কমিশনকে একটি যাচাইকরণ কমিটি গঠন করতে হবে, যারা দায়িত্বপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক সংগঠনগুলোকে নির্বাচনি কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিতে হবে, যাতে শিক্ষাঙ্গনের নৈতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
৭. মন্তব্য ও সুপারিশ :
যে রাষ্ট্রে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেখানে জনগণের ভোটাধিকারই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুতরাং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম কিংবা যে কোনো দলীয় শিক্ষকের নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োগ শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়—
এটি গণতন্ত্রের প্রতি নৈতিক অবমাননা।