রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১১:১২ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে নতুন এক জাহাজ ভেসে উঠেছে—তার নাম Offshore Production Sharing Contract-2026 (PSC-2026)। নামটা শুনতে কাগজপত্রের মতো শুকনো হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সমুদ্রের নোনা গন্ধ, ঢেউয়ের গর্জন আর ভবিষ্যতের ঝলমলে স্বপ্ন। অন্তর্বর্তীকালীন ড. মুহাম্মদ ইউনুস সরকারের সময়ে অনুমোদিত এই PSC-2026 যেন বঙ্গোপসাগরের বুকে লেখা নতুন এক প্রেমপত্র—রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমুদ্রকে বলা, “তোমার বুকের নিচে যে আগুন লুকিয়ে আছে, এবার তাকে জাগাও।”
আর এই গল্পে ভোলা যেন কেবল দর্শক নয়, একেবারে নায়ক। এমন নায়ক, যে নিজেও প্রথমে বুঝতে পারেনি—তার শান্ত নদী, কাদামাখা চর আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলো একদিন আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতির আলোচনায় জায়গা করে নেবে।
ভোলাকে PSC-2026-এ সরাসরি আলাদা অধ্যায় হিসেবে লেখা না হলেও, পুরো চুক্তির শরীরে তার উপস্থিতি ঠিক নদীর জোয়ারের মতো—চোখে কম পড়ে, কিন্তু শক্তি সবচেয়ে বেশি। বঙ্গোপসাগরের offshore block-গুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, ভোলা যেন সমুদ্রের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিরহংকার প্রহরী। পশ্চিমে তেঁতুলিয়া, পূর্বে মেঘনা, দক্ষিণে উত্তাল সাগর—সব নদী এসে যেন ভোলার কানে কানে বলে, “তোর কপাল খুলতে চলেছে রে ভাই!”
PSC-2026-এর নীতিনির্ধারকেরা হয়তো কাগজে ভোলার নাম খুব বেশি লিখেননি, কিন্তু ভোলার নদীগুলোকে তারা এড়িয়ে যেতে পারেননি। কারণ offshore exploration মানে শুধু সমুদ্রের মাঝখানে rig বসানো নয়; এর মানে জাহাজ চলবে, সরঞ্জাম আসবে, গ্যাস উঠবে, পাইপলাইন যাবে, কর্মীরা নামবে—আর এসবের জন্য দরকার নদীমাতৃক নিরাপদ প্রবেশপথ। তখন মেঘনা নদী যেন বুক ফুলিয়ে বলে ওঠে, “দেখছো! এতদিন শুধু ইলিশ বইছি, এখন দেশের অর্থনীতিও বইব!”
ভোলার নদীগুলোরও যেন আলাদা ব্যক্তিত্ব আছে। তেঁতুলিয়া নদী একটু দাপুটে স্বভাবের—ঝড় এলে ভয় দেখায়, আবার শান্ত দিনে আয়নার মতো ঝকঝক করে। মেঘনা আবার অভিমানী; একটু রাগ করলে পাড় গিলে খায়। অথচ PSC-2026-এর আলোচনায় এই নদীগুলোকেই ভাবা হচ্ছে ভবিষ্যতের energy corridor হিসেবে। যেন নদীগুলো হঠাৎ করেই কৃষকের নৌকার বদলে গ্যাসবাহী জাহাজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
ভোলার জেলেরা অবশ্য এসব দেখে মাঝেমধ্যে মজা করে। এক বৃদ্ধ জেলে নাকি বলেছিলেন,
“আগে বিদেশিরা আসত ইলিশ খেতে, এখন আসবে গ্যাস খুঁজতে!”
চায়ের দোকানে তখন হাসির রোল পড়ে যায়। কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও একটু গর্ব লুকিয়ে থাকে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছে—যে সমুদ্র এতদিন কেবল ঝড় পাঠাত, সেই সমুদ্রই হয়তো এবার উন্নয়ন পাঠাবে।
PSC-2026-এ ভোলার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় এর ভৌগোলিক অবস্থানে। সমুদ্রের এত কাছে থেকেও ভোলা যেন বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এক অদ্ভুত ভারসাম্য ধরে রেখেছে। offshore block থেকে তোলা গ্যাস তীরে আনার ক্ষেত্রে ভোলার নদীপথ, মোহনা ও উপকূলীয় এলাকা হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে কার্যকর রুট। যেন প্রকৃতি নিজেই বহু আগে মানচিত্র এঁকে রেখেছিল, আর সরকার এখন শুধু সেই পুরোনো মানচিত্রের ধুলো ঝেড়ে নতুন নাম দিয়েছে—“PSC-2026”।
তবে এই গল্পে কেবল স্বপ্ন নেই, শঙ্কাও আছে। ভোলার মানুষ জানে সমুদ্র কখনও পুরোপুরি আপন হয় না। offshore drilling-এর কথা উঠলেই জেলেরা একটু কপাল কুঁচকে তাকায়। তারা ভয় পায়—যদি তেলের দাগ পানিতে পড়ে? যদি মাছ কমে যায়? যদি সমুদ্র রাগ করে? তখন নদীগুলোও যেন চুপ হয়ে যায়। কারণ উন্নয়নের ঢাক যত জোরে বাজে, প্রকৃতির কান্নাও কখনও কখনও তত নিঃশব্দে শোনা যায়।
তারপরও ভোলার আকাশে এখন আশার রং বেশি। ঘাটে দাঁড়িয়ে তরুণেরা বিদেশি কোম্পানির নাম শিখছে, স্কুলের ছাত্ররা “petroleum engineering” শব্দ উচ্চারণ করার চেষ্টা করছে, আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে মনে হিসাব কষছে—নতুন জেটি হলে দোকানের বিক্রি কত বাড়বে। PSC-2026 যেন পুরো ভোলাকে নতুন এক নাটকের মঞ্চে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে নদী চরিত্র, সমুদ্র পটভূমি, আর গ্যাস হলো গল্পের গুপ্তধন।
একসময় ভোলাকে মানুষ চিনত ঝড়ের দ্বীপ হিসেবে। এখন ধীরে ধীরে তাকে বলা হচ্ছে সম্ভাবনার দ্বীপ। মেঘনা, তেঁতুলিয়া আর বঙ্গোপসাগর যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ভোলাকে বলছে—
“তুই এতদিন দেশের শেষ প্রান্ত ছিলি, এবার হয়তো তুইই হবি নতুন শুরুর কেন্দ্র।”