শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০১ পূর্বাহ্ন
১. ভূমিকা
বিচারব্যবস্থা মানব সভ্যতার ন্যায়বোধের কেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মামলার জট, বিচার বিলম্ব, ও প্রশাসনিক জটিলতা আমাদের আদালতগুলোকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন ন্যায়বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা, গতি এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হলো — বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত?

২. বিশ্ব প্রেক্ষাপট: ন্যায়বিচারে এআই এর ব্যবহার
বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে আদালতের কাজে এআই ব্যবহার শুরু করেছে।
চীন ২০১৯ সালে চালু করেছে “Smart Court System” যেখানে এআই বিচারক, ভয়েস রিকগনিশন ও স্বয়ংক্রিয় রায় প্রস্তুতির প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২4 সালের হিসাব অনুযায়ী, চীনের ৯০% আদালত ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত।
এস্তোনিয়া ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ২০২০ সালে “Robot Judge” পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে, যেখানে ছোট অঙ্কের বাণিজ্যিক বিরোধে এআই বিচার করে থাকে।
যুক্তরাজ্য-এর আদালতগুলোতে “Predictive Analytics” ব্যবহারের মাধ্যমে মামলার পূর্বানুমান, প্রমাণ বিশ্লেষণ ও আইনি ব্যয় নির্ধারণে সহায়তা করা হয়।
ভারত ২০২3 সালে “Supreme Court AI Portal (SUPACE)” চালু করেছে, যা রায় প্রস্তুতির সময় বিচারকদের রেফারেন্স ও প্রাসঙ্গিক মামলা সাজেস্ট করে।
এইসব উদাহরণ দেখায়—এআই এখন ন্যায়বিচারের সহায়ক শক্তি, বিচারকের বিকল্প নয় বরং তার সহযোগী।
৩. বাংলাদেশের অবস্থা:
বাংলাদেশ এখনো বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহার পর্যায়ে প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। তবে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষণীয়—
(১) ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প:
সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পের আওতায় মামলার ফাইল, নোটিশ, ও রায় ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে।
সূত্র: The Daily Star, ২৩ মে ২০২৪।
(২) আইসিটি ট্রাইব্যুনাল ও ভিডিও কনফারেন্সে বিচার:
কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি বাংলাদেশের আদালতে নিয়মিত হয়েছে, যা এআই সংযোজনের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করেছে।
(৩) এআই-ভিত্তিক ডকুমেন্ট স্ক্যানিং ও সার্চিং:
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আদালতের মামলার ডাটাবেজে মেশিন লার্নিং ব্যবহারের একটি পাইলট প্রকল্প ২০২৫ সালের শুরুতে শুরু হয়েছে (সূত্র: The Business Standard, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।
তবে এখনো বিচারপ্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই সরাসরি ভূমিকা রাখছে না—এটি মূলত প্রশাসনিক ও গবেষণা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
৪. সম্ভাবনা: কেন প্রয়োজন এআই আদালতে:
(১) মামলার জট নিরসন:
বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন (সূত্র: Law Commission, ২০২৪)। এআই নির্ভর কেস ম্যানেজমেন্ট ও প্রেডিকশন মডেল ব্যবহার করলে মামলার অগ্রাধিকার ও সময় নির্ধারণ দ্রুততর করা সম্ভব।
(২) স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা:
এআই নিরপেক্ষভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, ফলে পক্ষপাত বা দুর্নীতির সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
(৩) আইনজীবীদের সহায়তা:
এআই চালিত “Legal Research Assistant” ব্যবহার করে আইনজীবীরা দ্রুত প্রাসঙ্গিক মামলা, রায়, ও ধারা খুঁজে পেতে পারেন।
(৪) ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ:
সাইবার ক্রাইম বা কর্পোরেট মামলাগুলোতে এআই-এর ফরেনসিক অ্যালগরিদম অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
৫. ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ :
তবে এই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে—
(১) অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত (Algorithmic Bias):
যদি প্রশিক্ষণ ডেটা পক্ষপাতমূলক হয়, তবে এআই-এর সিদ্ধান্তও পক্ষপাতদুষ্ট হবে—যা বিচার ব্যবস্থায় বিপজ্জনক।
(২) গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা:
বিচার সংক্রান্ত ডাটায় ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার তথ্য থাকে। সাইবার সুরক্ষা দুর্বল হলে তা জাতীয় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
(৩) আইনগত দায়বদ্ধতা:
এআই দ্বারা প্রদত্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা সুপারিশে ভুল হলে দায় নেবে কে—বিচারক, প্রোগ্রামার, না সরকার? এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।
(৪) নৈতিক প্রশ্ন:
ন্যায়বিচার শুধু তথ্য বিশ্লেষণ নয়; এতে মানবিকতা, সহানুভূতি, এবং প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়—যা এআই পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না।
৬. ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা:
বাংলাদেশের জন্য এআই-বিচারব্যবস্থায় সফল প্রবেশের পূর্বশর্তগুলো হলো—
জাতীয় এআই নীতিমালা (AI Policy for Justice Sector) প্রণয়ন।
বিচারক ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ—এআই নৈতিকতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন।
ডেটা প্রটেকশন আইন বাস্তবায়ন ও আদালতের তথ্য সুরক্ষার কঠোর কাঠামো গঠন।
পাইলট কোর্ট প্রকল্প শুরু করা—যেখানে ছোটখাটো দেওয়ানি মামলায় এআই সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
৭. উপসংহার
এআই বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে পারে—যদি তা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের আদালত এখন প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, দক্ষতা ও নৈতিক নেতৃত্ব।
অন্যথায়, এআই ন্যায়বিচারের হাতিয়ার না হয়ে অন্যায়ের ঢালেও পরিণত হতে পারে।