সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর দেশটির ২৬তম পার্লামেন্ট বা নেসেটে (Knesset) তিনজন আরব মুসলিম নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন মাহা কারকাবি-সাব্বাহ, নিহায়া ওয়াশাহি ও ইমান খতিব-ইয়াসিন।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে তাঁদের নির্বাচিত হওয়া দেশটির সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আলোচনায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নতুন পার্লামেন্টে মোট ৩৩ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন।
২. নির্বাচিত তিন নারী সদস্যের পরিচিতি
ক. মাহা কারকাবি-সাব্বাহ (Maha Karkabi-Sabbah)
তিনি একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে আরব সমাজ, পরিবার, নারী ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জয়েন্ট লিস্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
খ. নিহায়া ওয়াশাহি (Nihaya Washahi)
তিনি জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচিত নারী সদস্য। আরব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর সংসদীয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গ. ইমান খতিব-ইয়াসিন (Iman Khatib-Yassin)
তিনি রা’আম (Ra’am) দলের রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী। ২০২০ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে প্রথম হিজাব পরিহিত নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে সমাজকর্ম ও নারী-অধ্যয়ন রয়েছে। নারী অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
৩. নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্ট ১১টি এবং রা’আম ৮টি আসন পেয়েছে। অর্থাৎ আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক জোট মোট ১৯টি আসন অর্জন করেছে।
এই ফলাফল ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের সংসদে অংশগ্রহণ কেবল নারী ক্ষমতায়নের বিষয় নয়; এটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তবে তাঁদের নির্বাচিত হওয়া মানেই ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি বা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রশ্নে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান, সংসদীয় কার্যক্রম এবং নীতিনির্ধারণে ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
৪. নারী নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব
গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে নয়; বরং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, নারী এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত।
ইসরায়েলের নতুন পার্লামেন্টে মুসলিম নারীদের এই প্রতিনিধিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব, নাগরিক অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
উপসংহার
ইসরায়েলের পার্লামেন্টে মুসলিম নারীদের নির্বাচিত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে তাঁরা সংসদে নারী অধিকার, নাগরিক সমতা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তার ওপর।
রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। *[ লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক ]*