রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৮ অপরাহ্ন
১। ভূমিকা :
১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” নামে যে রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল একটি ঐতিহাসিক চিন্তাচেতনার বিপ্লব। ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের উপর ভিত্তি করে একটি সার্বভৌম, স্বনির্ভর ও স্বদেশভিত্তিক চেতনার জন্ম দেন তিনি। এরই পরিপূরক হিসেবে তিনি ঘোষণা করেন তাঁর “১৯ দফা কর্মসূচি”, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতিকে একটি মৌলিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর রূপরেখা ছিল।
কিন্তু ২০২৩ সালের শেষদিকে, লন্ডনপ্রবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর তথাকথিত “৩১ দফা রাষ্ট্রপুনর্গঠন রূপরেখা” ঘোষণা করে কার্যত জিয়ার জাতীয়তাবাদী দর্শনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন। এই দফাসমূহের কোথাও “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” শব্দটি উচ্চারিত হয়নি, বরং তার পুরো কাঠামোই একটি পশ্চিমাসর্বস্ব NGO-ধাঁচের প্রশাসনিক রূপান্তরের দিকে ঝুঁকে আছে।
২. জিয়ার ‘১৯ দফা’ মূলত একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের খসড়া :
সংক্ষেপে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ছিল:
(১) ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা,
(২) দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ,
(৩) গ্রামীন অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব,
(৪) আত্মনির্ভরশীলতা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া,
(৫) স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতীয় আধিপত্য থেকে সরে আসার আহ্বান।
ব্যাখা করে বলতে গেলে, বলতে হবে যে,
জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন ছিল আত্মপ্রত্যয়ী, উদ্দীপনামূলক ও জাতীয় ঐক্যকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা এক রাজনৈতিক কৌশল। এখানে ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি—all were interwoven with a nationalist mission rooted in post-colonial identity.
৩. তারেকের ‘৩১ দফা’ মূলত এক প্রকার NGO আদল :
সংক্ষেপে তারেক রহমানের ৩১ দফার মূলকথা হলো :
(১) Good governance,
(২) Judicial reform,
(৩) Administrative decentralization,
(৪) E-governance and anti-corruption mechanisms,
(৫) Climate justice, gender equality, and secular legal reforms.
এই দফাসমূহ কার্যত জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পরামর্শে রচিত একটি “রিফর্মিস্ট ম্যানুয়াল”। এতে নেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, গ্রামীণ অর্থনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বা জাতীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার কোনো প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। এর বদলে আছে প্রযুক্তিনির্ভর বেসরকারি সুশাসনের চটকদার প্রতিশ্রুতি।
৪. ৩১ দফা কার্যত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর চরম অবমাননা :
তারেক রহমানের এই ৩১ দফায় যা অনুপস্থিত:
(১) “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” শব্দটির উল্লেখ,
(২) ইসলামী মূল্যবোধ ও জাতীয় সংস্কৃতির স্বীকৃতি,
(৩) গ্রামীণ অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরতা-কেন্দ্রিক কোনো রূপরেখা,
(৪) ভারতীয় হস্তক্ষেপ বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ সম্পর্কে কোনো সতর্কতা,
(৫) জিয়ার ১৯ দফার কোনো ধারাবাহিকতা বা রেফারেন্স।
অর্থাৎ, তারেক রহমান রাজনীতিকে সম্পূর্ণ এক প্রকার প্রকল্পভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কার উদ্যোগে রূপান্তর করেছেন, যেখানে জাতি, আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা বা ইসলামভিত্তিক মূল্যবোধ একেবারেই অনুপস্থিত। এই রূপান্তরই “জিয়াউর রহমানের আদর্শকে কবর দেয়া”—এমন নয়, বরং সেই কবরের উপর শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া।
৫. জাতীয়তাবাদ থেকে কসমোপলিটান সংস্করণে রূপান্তর :
তারেকের রাজনীতি এখন একধরনের transnational elite-driven politics—যেখানে ব্যতিক্রমহীনভাবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে অনুসরণ করাই একমাত্র পথ। ফলে জিয়ার মতো একজন রাষ্ট্রনায়কের তৈরি দর্শন এখানে পরিণত হয়েছে শুধুমাত্র “ঐতিহাসিক অতীত” হিসেবে বইয়ের পাতায় ঠাঁই পাওয়া এক স্মৃতিচারণে। তারেক রহমান সাথে জিয়াউর রহমানের রক্তের সম্পর্ক আছে ঠিকই, কিন্তু আদর্শের সম্পর্ক নেই। যেদিন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করে, সেদিন থেকে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি রাষ্ট্রদর্শন Cosmopolitan Appearance-এ প্রবেশ করে।
৬. পথহারা তারেকের হাতে বিএনপির আত্মপরিচয় বিলুপ্ত :
তারেক রহমান যখন জিয়ার আদর্শ ভুলে যান, তখন সেটা শুধু রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব নয়, বরং বিএনপির আত্মপরিচয়ের বিলুপ্তি। তাঁর ৩১ দফা বাস্তবায়ন হলে বিএনপি আর “জাতীয়তাবাদী দল” হিসেবে থাকছে না; বরং এটি পরিণত হবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার ক্লাব-এ।
এটাই ছিল তারেকের রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম কৃত্য—জাতীয়তাবাদী দর্শনের উপরে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনীতি শুরু করে, সেই দর্শনেরই কবরে পেরেক ঠোকা।