শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন
হাবিবুর রহমান চৌধুরী শামীম
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) থেকে ।।
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা সদরে গত সোমবার (৭ জুলাই) দুপুরে সংঘটিত চার ঘণ্টাব্যাপী ভয়াবহ সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো শহর।

দুই পক্ষের সংঘাতে নিহত হয়েছে এ্যম্বুলেন্স চালক, আহত হয়েছেন শতাধিক। সংঘর্ষে শহরের শতাধিক দোকানপাট, ক্লিনিক, হাসপাতালসহ বহু স্থাপনায় চালানো হয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ—ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকার।প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুজনের ব্যক্তি বিরোধকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এ ভয়াবহ সংঘাতের ঘটনা।

দৈনিক আলোকিত সকাল পত্রিকার নবীগঞ্জ প্রতিনিধি আশাহিদ আলী আশা ও হবিগঞ্জের সময় পত্রিকার প্রকাশক সেলিম তালুকদারের মধ্যকার পেশাগত দ্বন্দ্ব ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে মিথ্যা অপপ্রচারে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নবীগঞ্জ শহর। এর জেরধরে গত ৪ জুলাই শুক্রবার আশাহিদ আলী আশার ও তিমিরপুর গ্রামের খরছু মিয়া ও তাঁর লোকজনের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে ।

হামলার পর তিমিরপুর গ্রামের দুই তরুণকে পুলিশে দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে এই বিরোধ আনমুন (মৎস্যজীবী) ও তিমিরপুর (অমৎস্যজীবী) গ্রামের মধ্যে সম্প্রদায়ভিত্তিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত ৭ জুলাই সোমবার দুপুরে পূর্বঘোষিতভাবে উভয় পক্ষ নবীগঞ্জ শহরের মধ্যবাজার এলাকায় দেশীয় অস্ত্রসহ জড়ো হয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলে সংঘর্ষ, শহরে সৃষ্টি হয় ভীতিকর পরিস্থিতি।সংঘর্ষে তিমিরপুর গ্রামের এম্বুলেন্স চালক ফারুক তালুকদার নিহত হন। আহত হন অন্তত শতাধিক।

এর মধ্যে আনমনু গ্রামের আউয়াল মিয়ার পুত্র রিমন মিয়া সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শহরের দেড় শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিক-হাসপাতাল। শহরের প্রধান সড়কজুড়ে পড়ে থাকে ইটের টুকরো ও ধ্বংসস্তূপ। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঐদিন বিকাল ৪ টায় জারি করা হয় ১৪৪ ধারা, যা মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে জানিয়েছেন নবীগঞ্জ ইউএনও রুহুল আমিন। সংঘর্ষের ঘটনায় সোমবার ও মঙ্গলবার মিলে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন, পৌরসভার শিবপাশার সফিক মিয়ার পুত্র মোঃ শাহিন তালুকদার,বাউসা ইউনিয়নের রিপাতপুর গ্রামের মৃত মুসাব্বির মিয়ার পুত্র মোঃ রুহুল আমিন (৩৪),পৌরসভার চরগাও গ্রামের মৃত রাজ্জাক চৌধুরীর পুত্র আব্দুল বাকির চৌধুরী এমরান (৪৩),একই গ্রামের মনয় মিয়ার পুত্র মোঃ নাঈম মিয়া (২০),রেছত মিয়ার পুত্র মোঃ কাজল মিয়া (৬০), মৃত মসলন চৌধুরীর পুত্র
মোঃ ছালিক আহেমেদ চৌধুরী (৭৫),ফরস চৌধুরীর পুত্র মোঃ মুন্না চৌধুরী (২৮)। সোমবার রাতে আটককৃত হলেন,গ্রেফতারকৃত হলো পৌরসভার চরগাও গ্রামের মতিউর রহমান চৌধুরীর পুত্র মোঃ এমদাদুল চৌধুরী (৩৫),পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের মরম আলীর পুত্র মোঃ রবিউল ইসলাম (২১) একই গ্রামের মৃত দালাল মিয়ার পুত্র মোঃ সাকিব মিয়া (২১) করগাও ইউনিয়নের ছোট শাখোয়া গ্রামের মৃত আজিজুল মিয়ার পুত্র মোঃ রফিক মিয়া( ৫২)। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, মঙ্গল ৮ জুলাই সকাল থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।সকালে ব্যবসায়ীরা ভাঙা দোকানপাট সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। মধ্যবাজারের ব্যবসায়ী কানু রায় বলেন, আমি কোনো পক্ষের নই, তবু আমার দোকানের সাটার ভেঙে দিয়েছে। মালামাল লুট হয়ছে। এখন দিশেহারা হয়ে গেছি।নতুনবাজারের এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, এ সংঘর্ষে অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে গেছেন। প্রশাসন আগে থেকেই ব্যবস্থা নিলে এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না।নিহত ফারুক মিয়ার জানাজা মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।তিমিরপুরের সাবেক পৌর কাউন্সিলর আলাউদ্দিন বলেন, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। সামান্য উত্তেজনা বড় সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এভাবে মৎস্যজীবী ও অমৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের বিভেদ সমাজে বড় সংকট সৃষ্টি করবে।’নবীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ছাবির আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘দেড় শতাধিক দোকানপাট ও ক্লিনিক পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি হয়তো এমন হতো না।’নবীগঞ্জ থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, এ ঘটনার সাথে জড়িত দুইদিনে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত আছে। তবে এখনো কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দেননি। পুলিশ নিজ উদ্যোগে তদন্ত করছে।ইউএনও রুহুল আমিন জানান, ‘উভয় পক্ষ সময় চেয়ে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আকস্মিকভাবে সহস্রাধিক মানুষ সংঘর্ষে জড়ায়। পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ছাড়া হঠাৎ ১৪৪ ধারা জারি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।’স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এ সংঘর্ষের রেশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
মোঃ হাবিবুর রহমান চৌধুরী শামীম
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)
তারিখ ০৮/০৭/২০২৫ইং