রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৩ অপরাহ্ন
১. আবার জঙ্গিবাদে গন্ধ*
২৬ এপ্রিল ২০২৬। সকালের আলো তখনও পুরোপুরি জানালার কাঁচে বসেনি। কিন্তু মানুষের মনের ভেতর ঢুকে গেছে এক অদৃশ্য অন্ধকার। দৈনিক পত্রিকার প্রধান শিরোনাম যেন হঠাৎ করেই বাতাসে ছড়িয়ে দিল শঙ্কার গন্ধ—
“জঙ্গি হামলার আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার…”
শহরের ব্যস্ত মোড়গুলোতে পুলিশি টহল বেড়েছে, চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র সতর্কতা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—এ সতর্কতা কি বাস্তব বিপদের জন্য, নাকি আরেকটি সুপরিকল্পিত ‘ভয়ের গল্প’ রচনার সূচনা?
*২. ভয়ের পুনর্জন্ম*: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জঙ্গি” শব্দটি কেবল নিরাপত্তার ভাষা নয়, এটি বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যখন অতীতে ক্ষমতায় আসে, তখন বাংলার মাটিতে এক নতুন চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে—বাংলাভাই, শায়েখ আবদুর রহমান। তারা যেন হঠাৎ করেই আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসে, আবার সময়ের সাথে সাথে মিলিয়েও যায়।
এই চরিত্রগুলো কি সত্যিই ছিল কেবল আদর্শিক উগ্রবাদী, নাকি তারা ছিল এক বৃহত্তর রাজনৈতিক নাটকের নিখুঁতভাবে সাজানো দৃশ্যপট?
*৩. জঙ্গি ও জঙ্গি দমন– একই মুদ্রার দুই পিঠ*:
একটি অদ্ভুত বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়—
যেখানে জঙ্গির উত্থান, সেখানেই জঙ্গি দমনের নামে তৎপরতা, প্রকল্প, বিদেশি অর্থায়ন।
জঙ্গি দমনের নামে এণ্টি-টেররিজম কার্যক্রম—
কিন্তু সেই কার্যক্রমের আড়ালে কত নিরপরাধ মানুষের জীবন নিভে গেছে, তার হিসাব ইতিহাস কখনো পুরোপুরি দেয়নি।
ভয়ের ব্যবসা এখানে এক নতুন অর্থনীতি তৈরি করে—
একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে তার প্রতিকার দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অর্থ প্রবাহ।
*৪. এক শাসন থেকে আরেক শাসন–জঙ্গির উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি*:
শেখ হাসিনা-এর দীর্ঘ শাসনামলে “জঙ্গি নাটক” যেন নিয়মিত মঞ্চস্থ হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান, গ্রেপ্তার, ‘বন্দুকযুদ্ধ’—সব মিলিয়ে এক ধারাবাহিক নিরাপত্তা-নাটক।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই জঙ্গিবাদ যেন হঠাৎ করেই বিলীন হয়ে পড়ে।
কোথায় গেল সেই ভয়?
কোথায় গেল সেই তথাকথিত নেটওয়ার্ক?
এই নীরবতা কি প্রমাণ করে না—
জঙ্গিবাদ কখনো কখনো বাস্তবের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক নির্মাণ?
*৫. নতুন অধ্যায়–পুরোনো কৌশলের প্রত্যাবর্তন*:
আবার যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতার কাছাকাছি বা ক্ষমতায়, তখনই নতুন করে “জঙ্গি হামলার আশঙ্কা” সামনে আসে।
এ যেন পুরোনো নাটকের নতুন মঞ্চায়ন—
চরিত্র বদলায়, সংলাপ বদলায়, কিন্তু কাহিনি একই থাকে।
একটি প্রশ্ন তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—
এ কি কেবল নিরাপত্তা সতর্কতা, নাকি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ?
*৬. রাষ্ট্র, ভয় ও নাগরিক*: ভয় প্রদর্শন রাষ্ট্রের শক্তিশালী হাতিয়ার।
যখন মানুষ ভীত থাকে, তখন তারা প্রশ্ন কম করে, মেনে নেয় বেশি।
রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে ভয়ের আবহ তৈরি করে,
তাহলে সেই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
জঙ্গিবাদের বাস্তব হুমকি অবশ্যই অস্বীকার করা যায় না—
কিন্তু যখন সেই হুমকি বারবার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবির্ভূত হয়,
তখন তা কেবল নিরাপত্তা ইস্যু থাকে না, হয়ে ওঠে ক্ষমতার খেলা।
*৭. নাটকের আড়ালের বাস্তবতা*:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জঙ্গি” শব্দটি আজ আর কেবল একটি নিরাপত্তা টার্ম নয়—
এটি এক বহুমাত্রিক রাজনৈতিক রূপক।
প্রশ্ন হলো—
আমরা কি আবারও সেই পুরোনো নাটকের দর্শক হতে যাচ্ছি?
নাকি এবার দর্শক হয়ে বসে না থেকে, মঞ্চের আড়ালের কাহিনি বোঝার চেষ্টা করবো?
কারণ ইতিহাস বারবার বলে—
যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়,
সে সমাজই সবচেয়ে সহজে ভয়কে সত্য বলে মেনে নেয়।