শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ন
১. ভূমিকা :
২০২৫ সালের ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মোড় নির্দেশ করেছে। শিবিরের অকল্পনীয় ও একক আধিপত্যমূলক বিজয় শুধু ছাত্ররাজনীতির ভারসাম্য পরিবর্তন করেনি, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও এক ধরণের আগাম বার্তা দিয়েছে। এর আগে ডাকসুতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ছাত্রদলের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক চিত্র। অথচ এবারের নির্বাচনে ছাত্রদল কার্যত পরাজিত এবং শিবিরের বিজয় ছাত্রসমাজের মানসিকতার পরিবর্তনকে স্পষ্ট করেছে। রাকসু ও চাকসুতেও অনুরূপ চিত্র দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
২. ডাকসু-জাকসুর ফলাফল ও ছাত্রদলের বিপর্যয় :
ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন দখল করে নেয়। জাকসুতেও একই দৃশ্যপট। ছাত্রদলের প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রেই নাজেহাল হয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা ভোটে টিকে থাকতে পারেনি। এতটাই যে, চাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্রদল ইতোমধ্যেই শঙ্কিত হয়ে ঘোষণা দিয়েছে, “চাকসু নির্বাচনে যাব কিনা, ভেবে দেখবো” (সূত্র: দৈনিক আজকের পত্রিকা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পৃ১)।”
এই বিবৃতিই প্রমাণ করে, বিএনপির ছাত্রসংগঠন এখন ভয় ও হতাশার মধ্যে পড়েছে।
৩. বিশ্লেষকদের অভিমত :
(১). প্রথম আলোর উপসম্পাদক একেএম জাকারিয়ার অভিমত:
“২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দখলবাজি চাঁদাবাজির যত অভিযোগ উঠেছে, সেটাও শিক্ষার্থীদের ছাত্রদল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ বলে অনেকে মনে করেন। এসব বিবেচনায় ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীর বিকল্প হিসেবে ছাত্রশিবিরকে বেছে নিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতিতে যদি একই হিসাব-নিকাশ কাজ করে, তবে দল হিসেবে বিএনপির জন্য বিপদের বিষয়।”
(সূত্র: প্রথম আলো, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫; রাজনীতি বিভাগ, পৃ:১০)
(২). দৈনিক আজকের পত্রিকার উপসম্পাদক জাহীদ রেজা নূরের মন্তব্য:
“কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপি যেভাবে লুটপাট আর দখলবাজির রাজনীতি করেছে, তাতে বিস্মিত হয়েছে সাধারণ জনগণ। … রাজনীতির মাঠে ক্ষমতা ছাড়াই বিএনপি যে দাপট দেখাচ্ছে তার প্রভাব কি তাদের ছাত্রসংগঠনের উপর পড়বে না? … এরকম একটি বিষয় ডাকসু নির্বাচনে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।”
(সূত্র: দৈনিক আজকের পত্রিকা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫; সম্পাদকীয় বিভাগ, পৃ:৪)
(৩). বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্য :,
১১ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় যমুনা টিভির “রাজনীতি” আলোচনায় রুমিন ফারহানা বলেন,
রাজনীতির মৌল ভিত্তি হলো জনকল্যাণ, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিএনপি ও ছাত্রদল অনেক ক্ষেত্রেই সেই কল্যাণমুখী রাজনীতি থেকে বিমুখ হয়েছে। ত্যাগ ও সেবার পরিবর্তে তারা অনেক সময় ক্ষমতার দাপটকে প্রাধান্য দিয়েছে। এতে জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ছাত্রশিবির ও জামায়াতের জনকল্যাণমুখী রাজনীতির উদাহরণ তুলে ধরেন (সূত্র: যমুনা টিভি, রাজনীতি, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রাত ৯টা)
৪. জাতীয় রাজনীতির জন্য প্রভাব :
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের এই ফলাফলকে শুধু ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি জাতীয় রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি।
শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, ছাত্রশিবিরকে বেছে নেওয়া মানে ‘স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা’র প্রতীককে গ্রহণ করা।
ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ওঠা দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও অসংযত আচরণের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের ভোটের মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছে।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, বিএনপি ও ছাত্রদলের কল্যাণমুখী রাজনীতি থেকে বিচ্যুতি তাদের জনভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার প্রতিফলন ছাত্ররাজনীতিতেও ঘটছে।
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি একই ধরনের নেতিবাচক ইমেজ বহন করলে ভোটাররা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে বেছে নেবে।
৫. উপসংহার :
ডাকসু ও জাকসুর নির্বাচনে শিবিরের ‘ভূমিধস বিজয়’ বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ছাত্রদলের ভরাডুবি বিএনপির জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। বিশ্লেষক ও বিএনপির নিজস্ব নেতৃবৃন্দের কথায় স্পষ্ট, কল্যাণমুখী রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চাই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দলটি সময়মতো নিজেদের পুনর্গঠন না করতে পারে, তবে জাতীয় নির্বাচনে তারা আরও বড় ধাক্কা খাবে। সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নির্বাচনী ফলাফল কেবল একটি ক্ষুদ্র ক্যাম্পাস-ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বোঝার এক আগাম পাঠও বটে।