শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন
১. জামায়াতে ইসলামীর হিন্দু-সমাবেশ :
ডুমুরিয়ার আকাশে সেদিন সূর্যটা ছিল অদ্ভুত রঙের—
রক্তমেশানো কমলালেবুর মতো।
শরতের বাতাসে উড়ে আসছিল ঢাকের মৃদু ধ্বনি, আর মঞ্চের সামনে লাল, নীল, সবুজ পতাকা মিশে যাচ্ছিল মানুষের কোলাহলে।
যেন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লেখা হচ্ছে ধানের ক্ষেতে, নদীর তীরে, জনতার হৃদয়ে।

এই প্রথম—
খুলনার ডুমুরিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নামে এমন এক বিশাল সমাবেশ,
যেখানে মঞ্চে জামায়াতে ইসলামী—
আর দর্শক সারিতে হিন্দু পুরুষ, নারী ও তরুণরা হাততালি দিচ্ছে “দাঁড়িপাল্লা”-র নামে।
২. সম্মেলনের নাট্যপট :
সকাল থেকেই উপজেলা সদর হয়ে উঠেছিল উৎসবের মেলা।
বেলুন, ব্যানার, ও শ্লোগানে ছাওয়া পুরো মাঠ।
“আমরা আর সংখ্যালঘু নই—আমরা বাংলাদেশি!”
এই শ্লোগানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিটি কণ্ঠস্বর।
মঞ্চে উঠে জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বললেন,
> “হিন্দুদের আর ব্যবহার করা যাবে না। তারা এই দেশের মাটির মানুষ, তাদেরও ভাগ্যোন্নয়ন চাই।”
শব্দগুলো ছিল রাজনৈতিক, কিন্তু তাতে অদ্ভুত এক মানবিক সুর।
যেন এক নতুন কৌশল—
ইসলামী রাজনীতিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে সামাজিক সহাবস্থানের পরিভাষা।
৩. ডুমুরিয়ার মাটি ও সময়ের চিত্র :
খুলনার দক্ষিণাঞ্চল—
যেখানে নদী যেমন বারবার চর বদলায়, তেমনি রাজনীতিও বদলায় রঙ ও কণ্ঠস্বর।
একসময়ে এই অঞ্চলে জামায়াতের নাম উচ্চারণই ছিল ভয়ানক।
কিন্তু এখন সেই দলই আয়োজন করছে “হিন্দু উন্নয়ন সম্মেলন”—
এ যেন এক উল্টোধারার রাজনীতি, যেখানে ধর্মের সীমারেখা ব্যবহার করা হচ্ছে “একতার ভাষা” হিসেবে।
তবে স্থানীয়দের মুখে ভিন্ন সুরও শোনা যায়।
এক বয়স্ক হিন্দু কৃষক বললেন,
> “ভাই, আমাদের আগে কেউ এভাবে ডাকে নাই। কিন্তু ভোটের সময় সবাই দরদ দেখায়।”
তার চোখে ছিল সংশয়, কিন্তু কণ্ঠে লুকানো আশা—
সম্ভবত প্রথমবারের মতো কেউ তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
—
৪. রাজনৈতিক মঞ্চের গভীর কৌশল:
এই সম্মেলনের পেছনে কেবল ধর্মীয় বন্ধুত্ব নয়—
রয়েছে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক পরিকল্পনা।
জামায়াতে ইসলামী এখন যে পুনর্গঠনপর্বে আছে,
সেখানে “সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি” হলো ইমেজ রিব্র্যান্ডিংয়ের নতুন হাতিয়ার।
“দাঁড়িপাল্লা” এখন শুধু ভোটের প্রতীক নয়—
এটি হয়ে উঠছে “ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যের প্রতীক” হিসেবে প্রচারযোগ্য এক গল্প।
আর এই গল্পে যুক্ত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, যা ঐতিহাসিকভাবে বিরল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,
> “এটি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে নতুন এক প্রপঞ্চ।
যেখানে ইসলামপন্থী দল নিজেই ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকে প্রবেশের দরজা খুলছে।”
৫. সুদূরপ্রসারী ফলাফল :
এই সমাবেশ কেবল স্থানীয় রাজনীতির নয়—
এর প্রতিধ্বনি পৌঁছে যাচ্ছে জাতীয় অঙ্গনে।
যদি এই কৌশল সফল হয়,
তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে “ধর্মভিত্তিক পুনর্মিলনের রাজনীতি” নামে এক নতুন ধারার সূচনা হতে পারে।
কিন্তু এর ঝুঁকিও কম নয়।
ধর্মের আবরণে রাজনীতির পুনরুত্থান আবারও বিভাজনের জন্ম দিতে পারে,
যদি আন্তরিকতা না থাকে—
যদি এ সব উদ্যোগ কেবল ভোটের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে।
রাজনীতির ইতিহাস বলে—
“যে দল বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয়, সে-ই সময়কে বদলায়।”
ডুমুরিয়ার এই সম্মেলন তাই সময়ের মোড় ঘোরানো এক রাজনৈতিক পরীক্ষা।
এর ফলাফল নির্ভর করবে—
মানুষ কি সত্যিই “একতার রাজনীতি” দেখতে চায়,
নাকি আবারো “ব্যবহার” হতে চায় আগের মতো।
৬. উপসংহার :
রাতের শেষে, সম্মেলন শেষে যখন মঞ্চ নিঃস্তব্ধ,
দূর থেকে দেখা যায়, কেউ একজন মাঠে দাঁড়িয়ে ধীরে বলছে—
> “আমরা সবাই বাংলাদেশি।”
তার কণ্ঠে ছিল না রাজনীতি,
ছিল এক নাগরিক চেতনার মৃদু আলোকরেখা।
আর সেই আলো হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে—
ডুমুরিয়ার এই মাঠ একদিন সত্যিই হয়ে উঠতে পারে
বাংলাদেশি পরিচয়ের পুনর্জন্মভূমি।