সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন
১. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক বিনিময়ের সূচনা*
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র Strategic Civil Nuclear Cooperation বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে। এর মূল লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, nuclear safety, security, safeguards, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা এবং non-proliferation কাঠামো শক্তিশালী করা। এটি সরাসরি কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা reactor কেনার চুক্তি নয়। এটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক সহযোগিতার সূচনা।
*২. রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক সহযোগিতার প্রতিপক্ষ নয়*
বাংলাদেশের বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির ভিত্তি রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। ২০১০ সালের Framework Agreement এবং ২০১১ সালের Inter-Governmental Agreement-এর মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পথ তৈরি হয়। ফলে রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়া এখনো বাংলাদেশের প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি রাশিয়ার সহযোগিতার অবসান ঘটাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। অপরঞ্চ এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক সহযোগিতায় নতুন একটি আন্তর্জাতিক অংশীদার যুক্ত করছে।
*৩. বাংলাদেশের স্ট্যাটেজি*
বাংলাদেশের জন্য এই সহযোগিতার গুরুত্ব কয়েকটি ক্ষেত্রে—
(১)- পারমাণবিক প্রযুক্তি ও জ্ঞান অর্জন;
(২)- বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ;
(৩)- nuclear safety ও security শক্তিশালী করা;
(৪)- ভবিষ্যৎ advanced reactor/SMR প্রযুক্তি সম্পর্কে সক্ষমতা অর্জন;
(৫)- একক বিদেশি অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো;
(৬)- ভবিষ্যৎ পারমাণবিক প্রকল্পে প্রযুক্তি ও অংশীদার নির্বাচনের বিকল্প বাড়ানো।
*৪. যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাটেজি*
যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের মধ্যে
রয়েছে non-proliferation ও nuclear security জোরদার করা এবং ভবিষ্যৎ civil nuclear technology ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা। মার্কিন সরকারি নীতিতেও civil nuclear cooperation-এর সঙ্গে non-proliferation এবং মার্কিন nuclear industry-এর আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।
*৫. বাংলাদেশ কি নিরপেক্ষ পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে?*
এখানেই চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক।
শুধু রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের সঙ্গে সহযোগিতা করলেই বাংলাদেশকে “নিরপেক্ষ পারমাণবিক শক্তি নীতি” গ্রহণ করেছে বলা যাবে না। তবে বর্তমান পদক্ষেপকে একক অংশীদারনির্ভরতা থেকে বহুমুখী পারমাণবিক সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা যায়।
বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচির একটি সম্ভাব্য ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো হতে পারে—
(১) রাশিয়া — রূপপুর ও বিদ্যমান প্রযুক্তিগত সহযোগিতা।
(২) যুক্তরাষ্ট্র — নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সহযোগিতা।
(৩)IAEA — আন্তর্জাতিক safeguards ও নিরাপত্তা কাঠামো ঠিক রেখে পথচা।
(৪) বাংলাদেশ — জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠা।
স্মরণ করা যেতে পারে যে,
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে NPT-এর পক্ষভুক্ত এবং IAEA safeguards ও Additional Protocol-এর আওতায় রয়েছে।
*৬. ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী পারমাণবিক স্ট্যাটেজিক অটোনমি*
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক সহযোগিতা তাই রাশিয়ার বিকল্প বেছে নেওয়ার ঘোষণা নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে বহুমুখী করার একটি নতুন দরজা।
বাংলাদেশ যদি রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, কিন্তু কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থ ও প্রযুক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী ও strategic-autonomy ভিত্তিক শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সারকথা: রূপপুরে রাশিয়া, সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, নিরাপত্তায় IAEA—আর কৌশলগত সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ।
*[ অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন পেশাদার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ]*