রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন
১. প্রস্তাবনা: একটি অনন্য সুযোগের অপচয় ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি :
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাবনা। যেমন ১৯৭৫ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালি শাসনের অবসানঘটে। কিন্তু বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিবর্তে সামরিক ক্ষমতার ছায়ায় রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, যার নাম বিএনপি। তেমনি ১৯৯০ সালে হুসেইন্ মুহম্মদ এরশশ স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পরেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে বিপ্লবের সুযোগ সীমিত রাখা হয়। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে। এই
অভ্যুত্থানের ইতিহাস মুছে ফেলা হয়। অভ্যুত্থানের ফল ঘরে নেয়ার পর অভ্যুত্থানের শহিদদেরও স্বীকৃত দেয়নি। অপর দিকে ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানকে হত্যাকাণ্ড অখ্যায়িত করে, নায়কদের বিচার ও ফাঁসির আদেশ জারি করা হয়েছে।
একইভাবে, ২০২৪ সালে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর বিপ্লবী সরকার গঠন না-করে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ফলে শুরুতেই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার পরাজয় ঘটে। ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের সুযোগটি হাতছাড়া হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। নেতৃত্বহীনতা, জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদও প্রকাশে দায়িত্বহীন পরিস্থতি তৈরি হয়। এটা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ভুল পন্থার মাধ্যমে। প্রতিবারই গণআকাঙ্ক্ষা ছিন্নভিন্ন হয়।
২. বিপ্লবী ঘোষণাপত্রের অনুপস্থিতি: রাজনৈতিক রূপরেখার শূন্যতা:
(ক) ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে নাটক:
১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালের মতো ২০২৪ সালের বিপ্লবেও নতুন রাষ্ট্রের আদর্শ ও কাঠামো নির্ধারণে কোনো ঘোষণাপত্র সামনে আসেনি। সময়োপযোগী রূপরেখা না থাকায় জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক মহল দ্বিধায় পড়ে যায়।
(খ) নেতৃত্ব ও আদর্শের সংকট:
কে নেতৃত্ব দেবে, গণতন্ত্রের রূপ কী হবে, পারিবারিক রাজনীতির অবসান ও বিদেশি আধিপত্যের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না থাকায় আন্দোলন পরে নানা মতপার্থক্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে—যা ১৯৭৫ ও ১৯৯০-এর ভুলকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
৩. বিপ্লবী সরকার গঠনের ব্যর্থতা:
(ক) অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্যহীনতা:
১৯৯০ সালে যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদর্শিক বিপ্লবকে প্রতিস্থাপন করেছিল, তেমনি ২০২৪ সালেও অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় জাতির সংলাপ, সম্মিলিত নেতৃত্ব বা নৈতিক ভিত্তি ছাড়াই। ফলে তারা প্রশাসনিক ক্ষমতা পেলেও জনআস্থার জায়গায় দাঁড়াতে পারেনি।
(খ) নেতৃত্বের ব্যক্তিগত মোহ ও বৈপরীত্য:
বিপ্লবোত্তর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের কেউ কেউ বিবাহ, ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত জীবনাচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, কেউ কেউ রাজনীতিক দল গঠনের… প্রতিযোগিতায় নামেন—ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল ১৯৭৫-এর পর সেনাসমর্থিত দল গঠনের প্রক্রিয়ায় এবং ১৯৯০-এর পর পুরনো দলগুলোর পুনর্জীবনে।
৪. বিএনপি কর্তৃক রাষ্ট্রযন্ত্রের পুনর্দখল :
(ক) প্রশাসনে নব্য-বিএনপি পুনঃপ্রবেশ:
১৯৯০-এর পর যেমন পুরনো শাসকগোষ্ঠী ফিরে এসেছিল, তেমনি ২০২৪ সালের পর প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগে বিএনপি ঘরানার ব্যক্তিরা অঘোষিতভাবে প্রবেশ করে। জনগণ হতবাক হয়ে দেখে যে ‘নতুন ভোর’-এর বদলে ফিরে এসেছে পুরনো ছায়া।
(খ) আদালতের মাধ্যমে পুনর্বাসন:
বিচারিক কাঠামো সংস্কার হওয়ায় আগেই বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিচারিক দায়মুক্তি ঘটে। মামলাগুলো একে একে প্রত্যাহার বা দুর্বলভাবে পরিচালিত হওয়ায় আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা চূর্ণ হয়।
৫. জনগণের চাওয়া বনাম নেতৃত্বের দ্বিধা :
(ক) আদর্শিক সংস্কার প্রত্যাশা:
মানুষ চেয়েছিল যুদ্ধাপরাধের পুনঃতদন্ত, দুর্নীতিবিরোধী কমিশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নীতির সংস্কার। কিন্তু নেতৃবৃন্দ সেই রূপরেখা না দিয়ে কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন।
(খ) বিপ্লবী কাঠামো গড়ে না-ওঠা:
১৯৭৫, ১৯৯০ এবং এখন ২০২৪—প্রত্যেক সময়ই বিপ্লব প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়, অথচ কাঠামোগত সংস্কার অনুপস্থিত থাকে।
৬. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া:
(ক) আন্তর্জাতিক হতাশা:
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের বিপ্লবকে গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ঘোষণাপত্র ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার অভাবে তারাও ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে।
(খ) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা:
ভারতসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ ১৯৯০-এর সময় যেমন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় ছিল, এবারও অনিশ্চিত কূটনৈতিক সম্পর্ক ও চুক্তির অভাবে নতুন সরকারের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়েনি।
৭. ইতিহাস কি ক্ষমা করবে:
(ক) নেতৃত্বের ব্যর্থতা আদর্শের বিপরীতে:
যে বিপ্লবীরা জনগণের চোখে নায়কে পরিণত হয়েছিলেন, তাঁরাই লক্ষ্যচ্যুত হয়ে খলনায়ক হয়ে উঠছেন। এই ইতিহাস ১৯৭৫-এর মতোই আবার পুনরাবৃত হচ্ছে।
(খ) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যায়ন হবে নির্মম:
যদি নেতৃত্ব চেতনা ও সাহসিকতার অভাবেই ব্যর্থ হন, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ব্যর্থতাকে শুধুই সময়ের অপচয় হিসেবে চিহ্নিত করবে, আর বিপ্লবকে দেখবে অপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে।
৮. বিপ্লবের পর নতুন বিপ্লব—চেতনার জাগরণ:
বিপ্লবের সফলতা কেবল সরকারের পতনে নয়, বরং আদর্শিক কাঠামো গঠনে। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ১৯৭৫, ১৯৯০ ও ২০২৪—এই তিনটি সময়ই প্রমাণ করে, বিপ্লবের পর নেতৃত্ব সৎ না-হলে, সুযোগসন্ধানীরা মঞ্চ দখল করেনেয়। এখনো সময় আছে। যদি সাহসিকতা, নৈতিকতা ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক রূপরেখার ভিত্তিতে নেতৃত্ব সামনে আসে, তবে সেই বিপ্লব আবারো অর্থবহ হতে পারে। নইলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই হবে আমাদের নিয়তি। বিপ্লবের নায়কেরা আগের মতোই খলনায়কে পরিণত হবেন! আর ইতিহাসের পরিবর্তে নির্মম ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখা যাবে! ১৯৭৫ ও ১৯৯০ এর মতোই ১০২৪-কে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের হাতিয়ার বানাতে দিবেন-না!