রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪০ অপরাহ্ন
বাংলার মাটি ও মানুষের ন্যায়ভিত্তিক পথচলায় কিছু মানুষ আলোকবর্তিকার মতো আবির্ভূত হন। তাঁদের সারা জীবন হয় আপসহীন আদর্শের দৃষ্টান্ত। অধ্যাপক সিরাজুল হক তেমনই একজন, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস, ন্যায়ের পক্ষে অবিচল দাঁড়ানোর দৃঢ়তা এবং সমাজ সংস্কারের নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াসের অনন্য প্রতীক ছিলেন।
জন্ম ও কর্মজীবনের শুরু
অধ্যাপক সিরাজুল হকের জন্ম ১৯৪৭ সালে। কর্মজীবনের সূচনা করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে। ভোলা জেলার শাহবাজপুর কলেজে তিনি ছিলেন বাংলা বিভাগের একজন অসাধারণ জনপ্রিয় অধ্যাপক। তবে তিনি শুধু পাঠদানের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়ে, সাহসের সঙ্গে অবস্থান নেন। একসময় সেই প্রতিবাদ তাঁকে চাকুরি ছাড়তে বাধ্য করে। কিন্তু থেমে যাননি। বরং শুরু করেন আরও বিস্তৃত এক যাত্রা—সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতি আন্দোলনের পথে।
সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা
চাকুরি ছেড়ে অধ্যাপক হক যোগ দেন সাংবাদিকতায়। তিনি দৈনিক আজাদ ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার বার্তা বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সম্পাদনা করেছেন মাসিক তাহজিব ম্যাগাজিন এবং ইরান তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত মাসিক নিউজ লেটার। তাঁর সাংবাদিকতা শুধু তথ্য পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল আদর্শবাদী ও বোধসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার।
বাংলাদেশ ও ইরানের সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে তাঁর অবদান ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। দুই দেশের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনে তিনি ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর।
লেখক ও চিন্তাবিদ
অধ্যাপক সিরাজুল হক ছিলেন এক দক্ষ লেখক ও চিন্তাবিদ। তিনি প্রায় ৩০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার প্রতিটি ছিল সমাজচিন্তা, শিক্ষা সংস্কার ও মূল্যবোধভিত্তিক ভাবনার প্রতিফলন। তিনি শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের একজন অগ্রসৈনিক হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। নতুন প্রজন্মের চরিত্রগঠনে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আয়োজন করতেন নৈতিকতা ও আদর্শভিত্তিক নানা কর্মসূচি।
গণমাধ্যমে সক্রিয়তা
তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে বা লেখালেখির ভুবনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল রেডিও বাংলাদেশ ও রেডিও তেহরান-এও। এ দুই সম্প্রচারে তিনি সময়ের প্রসঙ্গভিত্তিক নানা আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য পেশ করতেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল আন্তরিকতা, যুক্তি এবং সাহসের অনন্য সমন্বয়।
ব্যক্তিগত প্রভাব ও উত্তরাধিকার
অধ্যাপক সিরাজুল হক শুধু একজন শিক্ষক, সাংবাদিক বা সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বহু মানুষের Friend, Philosopher and Guide। আমি তাঁকে সবসময় দেখেছি একজন ন্যায়ের অনন্য সৈনিক হিসেবে—যিনি নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে, দৃঢ়চিত্তে লড়ে গেছেন মানুষের জন্য, সমাজের জন্য। তাঁর বাচনভঙ্গি, চিন্তার গভীরতা, এবং ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা আজও আমাদের আলো দেয়।
উপসংহার
২৬ জুন ২০২৫, অধ্যাপক সিরাজুল হকের দেহান্ত হলেও তাঁর আদর্শ ও চিন্তার বীজ বপিত হয়ে আছে হাজারো ছাত্র-ছাত্রী, পাঠক ও সমাজমনস্ক নাগরিকের হৃদয়ে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে সত্যের পথে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে ন্যায়ের পক্ষে কলম ধরতে হয়, আর কীভাবে একজন মানুষ নিজে আলো হয়ে চারপাশকে উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন।
তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি হোক ন্যায়ের পথে চলার দৃপ্ত অঙ্গীকারে।