বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেন বহুদিন পর রোদের নিচে ধুলোমাখা কোনো পুরোনো আইনগ্রন্থ হঠাৎ খুলে গেলে তার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কর গল্পেরা গুমগুম শব্দে জীবন্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ বছর ধরে ক্ষমতার অট্টালিকার ভিত বানাতে বানাতে যার হাতে আইন হয়ে উঠেছিল খোদাই করা শিলার মতো একমুখী—আজ সেই একই আইন যেন boomerang-এর মতো ফিরে এসে তাকে নিজস্ব বৃত্তে আঘাত করছে। যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) একসময় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিচার করে ফাঁসির রায় কার্যকর করেছিল—তারই কাঠামো, তারই ধারাবাহিকতা, আর সেই একই আইনের কঠোর অনুচ্ছেদগুলো আজ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে।
যে ধারায় তিনি অন্যদের বিচার করেছিলেন, ইতিহাসের এক অদ্ভুত ব্যঙ্গ—আজ সেই ধারা যেন আয়নার মতো তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, “আইন তো সবার জন্য সমান—তোমার জন্যও।” ক্ষমতার মঞ্চে তিনি একসময় ছিলেন রাজনীতির নায়িকা; আজ সেই মঞ্চেই তিনি বিচারবিধির চরিত্র। সময়ের এই নির্মম নাট্যবিন্যাসে কৌতুক আছে, আছে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গও—যেন ভাগ্য নিজে হাতে কোনো উপন্যাস লিখছে।
এদিকে শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে পলাতক অবস্থায়। দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে তিনি যেন এক ভূতুড়ে ছায়া—নেই অথচ সর্বত্র আছেন। তাঁর শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ বন্দিবিনিময় চুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পারস্পরিক অপরাধী প্রত্যর্পণের যে নেটওয়ার্ক তিনি সুচারুভাবে বুনেছিলেন—সেটিই এখন যেন তাঁর নিজের পা জড়িয়ে ধরা জালের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ironically, তিনি যে সেতু তৈরি করেছিলেন অন্যদের ফেরানোর জন্য—আজ সেই সেতুই তাঁকে ফেরানোর আইনগত পথ।
ভারত সরকারের জন্যও এটি কোনো নতুন ঝামেলা নয়। নতুন আইন করতে হবে না, সংসদে তুমুল আলোচনার দরকার নেই—শুধু পূর্ববর্তী চুক্তির ধারাগুলো অনুসরণ করলেই চলবে। আন্তর্জাতিক আইনের বিধান, দুই দেশের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে ভারতের সামনে এক প্রকার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। যেন দু’দেশের মধ্যে বহুদিন আগে লাগানো আইন-গাছ আজ ফল ধরেছে—আর সেই ফলের নাম ‘প্রত্যর্পণ’।
কিন্তু বিষয়টি শুধু ন্যায়বিচারের নয়—এটি শেখ হাসিনার নিজস্ব আইনি অধিকার রক্ষার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আইসিটিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর মাত্র এক মাসের মধ্যে আপিল করার সুযোগ আইনে নির্ধারিত। এই সময়টা যেন এক ছুটন্ত ট্রেন—দ্রুত উঠতে না পারলে ট্রেন আর থামবে না। ভারত যদি সহযোগিতা করতে দেরি করে, তবে তাঁর আপিল করার সুযোগ কার্যত বাতিল হয়ে যেতে পারে। এটি শুধু মানবাধিকার-বিরোধী নয়, রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন জ্বালামুখও খুলে দিতে পারে। রসিকতা করে বলা যায়—“আইন হাসিনার, ফাঁসিও হাসিনার—আর যদি আপিল না হয়, দায়ও হাসিনার!”
ঠিক এই সময়ে শেখ হাসিনার উচিত বিশ্বের সেরা সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনজীবী, মানবাধিকার অ্যাডভোকেট এবং ICT ও ICC–র অভিজ্ঞ আইনবিদদের নিয়ে একটি দৃঢ় প্রতিরক্ষা টিম গঠন করা। কারণ এই লড়াই কেবল তাঁর ব্যক্তিগত নয়—এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত এবং মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অবস্থানেরও পরীক্ষা। আইনি ময়দানটা এখন যেন দাবার ছক—অসতর্ক চাল পরাজয় ডেকে আনতে পারে, আর পরিপক্ব কৌশল শেষ মুহূর্তেও গেম বদলে দিতে পারে।
এসব প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে দ্রুত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক যোগাযোগ আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। দিল্লির দরজায় কড়া নাড়ার সময় এখনই—কারণ আইনের ঘড়ি অপেক্ষা করে না। দুই দেশের সরকার, আইন বিভাগ, এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট, ধীরস্থির এবং সময়ানুগ সমন্বয় ঘটলে তবেই এই জটিল সংকটের সমাধান মিলতে পারে।
অবশেষে বাংলাদেশের প্রত্যাশা একটাই—বিচার হবে অবশ্যই, কিন্তু ন্যায়বিচারের সব দরজা খোলা থাকবে। আদালতের রায় যেমন অপরিহার্য, তেমনি অভিযুক্তের আপিলের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র চাইছে—এই দুই চাকা একসঙ্গে ঘুরুক। কারণ বিচার যদি গাড়ি হয়, তবে একটি চাকা আইন, অন্যটি ন্যায়বিচার—একটি ছাড়া আরেকটি চলতে পারে না।