বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
১. ভূমিকা:
জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। রক্তঝরা সেই বিদ্রোহে জনগণ স্বপ্ন দেখেছিল—ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর বছরাধিক কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কোনো সুরাহা হয়নি। যেন বিপ্লবের অগ্নিশিখা ধোঁয়ায় পরিণত হয়েছে, অথচ দাউ দাউ করে জ্বলার কথা ছিল।
২. ফ্যাসিবাদের দোসরদের অটল প্রাচীর :
আজও রাষ্ট্রপতি চুপ্পু, সেনাপ্রধান ওয়াকার, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী দোসররা দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে। তারা যেন এক একটি গিরগিটির মতো—রঙ বদলালেও চরিত্র বদলায়নি। তাদের হাতে এখনো ক্ষমতার একাংশ, ফলে বৈপ্লবিক ধারা বারবার ষড়যন্ত্রে আক্রান্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অনেকটা সেই নদীর মতো, যার গতিপথ জনগণ ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু পুরোনো বাঁধ আবারও জোড়াতালি দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে।
৩. বহিঃশক্তির আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র :
ফ্যাসিবাদকে কবর দিতে গিয়ে জনগণ প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু আজ সেই কবরের উপর বারবার খনন চলছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা চায়—বিপ্লবকে দাফন করে পুনরায় পুরোনো শৃঙ্খল চাপিয়ে দিতে। যেন রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা শকুনরা সুযোগ পেলেই মৃতদেহে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
৪. নেতৃত্বের শূন্যতা ও অপূর্ণ কম্যান্ড :
ড. মুহম্মদ ইউনূসকে জনগণ বৈপ্লবিক সরকারের নেতৃত্বে চেয়েছিল। কিন্তু তার অধীনে এখনো প্রশাসনিক কম্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের প্রশাসনিক সেটআপ অসম্পূর্ণ; বিপ্লব-পরবর্তী সংহতি নেই। অবস্থা অনেকটা তীরবিহীন নৌকার মতো—জনগণ মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা নেই।
৫. নির্বাচনের অকাল প্রহসন :
প্রশ্ন জাগে—যখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণই নিশ্চিত হয়নি, তখন নির্বাচন কোন যুক্তিতে? অভ্যুত্থানের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল আমূল পরিবর্তন, শেকড়-উপড়ে নতুন রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু সেই কাজ না করেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন মানে হলো—মাটির নীচে লুকানো আগাছা না সরিয়েই ফুল বাগান করার চেষ্টা। এতে বিপ্লবের ফসল পচে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
৬. জুলাই সনদ ও Constituent Assembly নির্বাচন :
অভ্যুত্থানের পর জনগণ যে প্রত্যাশা করেছে, তার কেন্দ্রবিন্দু হলো জুলাই সনদ—যেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছিল, জনগণের ভোটে একটি Constituent Assembly নির্বাচন হবে, যারা নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে। কারণ ১৯৭২ সালের সংবিধান ছিল উপনিবেশিক কাঠামো থেকে কপি-পেস্ট; জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণে তৈরি হয়নি। এবার জনগণ আর সেই ভুল পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।
জনগণের দাবী সুনির্দিষ্ট:
নতুন সংবিধান প্রণয়ন ছাড়া নির্বাচন নয়।
রাষ্ট্রগঠন না হলে সংসদ নির্বাচন অর্থহীন।
Constituent Assembly-ই হবে বৈপ্লবিক রূপান্তরের ভিত্তি।
৭. সংবিধান প্রণয়ন ছাড়া নির্বাচন জনগণ মানবে না :
একটি বিপ্লব মানে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; এর মানে রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠন। যেমন একটি ভাঙা বাড়ির উপরে শুধু রঙ লাগালে তা নতুন হয় না—ভিত্তি না বদলালে আবার ধসে পড়বে। তেমনি নতুন সংবিধান ছাড়া নির্বাচন আসলে ফ্যাসিবাদেরই পুনরুত্থান ঘটাবে।
৮. উপসংহার :
গণ-অভ্যুত্থান জনগণের আত্মত্যাগের প্রতীক। সেই আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের জন্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিশ্চিত না করে অকাল নির্বাচন আয়োজন হবে আসলে জনগণের স্বপ্নের সঙ্গে প্রতারণা। জনগণ পাহাড় ভেঙে সমতল করেছে, কিন্তু এখনো তার ওপর নতুন ফসল বোনা হয়নি। জনগণের কণ্ঠ আজ একটাই—রাষ্ট্রগঠন আগে, নির্বাচন পরে।