রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৬ অপরাহ্ন
১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁর এই রাষ্ট্রচিন্তা ছিল একটি তৃতীয় পথ—যা বাঙালি জাতিয়তাবাদের সংকীর্ণতা ও পাকিস্তানি ধর্মভিত্তিক জাতিসত্তার বিভাজন থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও বহুমাত্রিক রাষ্ট্রপরিচয়ের ভিত্তি গঠনের চেষ্টা। তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল: ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় সহাবস্থান, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সম্মান, মুক্তিযুদ্ধের ঐক্যতান, জনগণের ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরতা।
জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল নতুন প্রজন্মের জন্য একটি রাষ্ট্রদর্শন, যা নিছক শ্লোগান নয় বরং একটি রাষ্ট্র নির্মাণের রূপরেখা। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ও রাজনৈতিক উত্তরসূরিদের হাতে এই আদর্শ শুধু অবহেলিতই হয়নি, বরং নানা রকম ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে সেটিকে কার্যত বিলীন করে ফেলা হয়েছে।
২. আদর্শ থেকে বিচ্যুতির পর্ব—-বিএনপির ভেতরের চিত্র :
(১)দলীয় কাঠামোর পরিবর্তন—-আন্দোলনমুখীতা থেকে সুবিধাবাদে যাত্রা:
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিএনপি সরকারে আসে। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই বিএনপি আন্দোলনভিত্তিক আদর্শিক দল থেকে রূপান্তরিত হতে থাকে প্রশাসনিক প্রভাব, লুটপাট ও ভাগ-বাটোয়ারাভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে দলীয়করণ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও আমলাদের মনোবান্ধব শাসন শুরু হয়।
জিয়াউর রহমান যেখানে প্রশাসনিক কাঠামোতে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, সেখানে তার উত্তরসূরিরা তা লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের আশ্রয় নেয়।
(২) ব্যক্তিপূজা ও পরিবারতন্ত্রের রূপায়ণ :
বিএনপিতে প্রথমদিকে নেতৃত্ব ছিল বহুমাত্রিক। নানা ধারার নেতাদের অবস্থান ছিল স্বীকৃত। কিন্তু ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্ব সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে একটি পরিবারকে ঘিরে। রাজনৈতিক মতবিনিময় ও গণতন্ত্রের জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিপূজা ও পরিবারনির্ভর আনুগত্য।
জিয়াউর রহমান যেখানে রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সেখানে পরিবারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আর রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে টিকে থাকেনি—পরিণত হয় নিছক একটি পরিচয়বাহী সাইনবোর্ডে।
(৩) বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অবসান ও কর্মীবাহিনীর নিঃস্বতা:
জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, সেনাবাহিনী, ছাত্র সমাজ ও পেশাজীবীদের একটি বৃহৎ অংশকে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর সময় আদর্শগত চর্চা ছিল বিস্তৃত, এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের চর্চা ছিল সচেতনভাবে।
তার বিপরীতে বিএনপির পরবর্তী নেতৃত্ব ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিক দলকে পরিণত করে ক্ষমতার হাতিয়ার ও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির অংশীদারে। রাজনৈতিক কর্মী হয়ে ওঠেন অর্থনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত দখলদার। চিন্তার জায়গায় আসে গোলামির সংস্কৃতি।
(৪) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় কৌশলে অস্পষ্টতা:
জিয়াউর রহমান নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির প্রবক্তা ছিলেন। তিনি ইসলামিক বিশ্ব, চীন, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি চালু করেন। কিন্তু বিএনপির পরবর্তী সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যত কোনো সুসংহত নীতি বা অবস্থান ছিল না। দলীয়ভাবে বিদেশে পালিয়ে থাকা, অদূরদর্শী লবিং, ভারতের প্রতি একতরফা বিরোধিতা ইত্যাদি কূটনৈতিক দুর্বলতার সৃষ্টি করে।
(৫) সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে আত্মবিরোধিতা
জিয়াউর রহমান জাতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করতেন। তিনি নজরুল, আল কুরআন, আরব বিশ্ব ও গ্রামীণ সমাজের চেতনা একত্র করার চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু খালেদা জিয়ার আমলে একদিকে মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, অন্যদিকে পশ্চিমা NGO সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে জাতীয় সংস্কৃতির ক্ষয় সাধিত হয়। এ দ্বৈত নীতির ফলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে।
৩. তারেক রহমানের ৩১ দফায় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ পুরোপুরি বিলুপ্ত :
তারেক রহমান ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পক্ষে “ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপুনর্গঠনের ৩১ দফা রূপরেখা” ঘোষণা করেন। এতে ছিল নির্বাচন, সুশাসন, বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, পরিবেশ, তরুণ সমাজ, প্রবাসীদের অধিকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কিছু কাঠামোগত প্রস্তাব।
তবে নিচের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দফাগুলোর কোথাও “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” নামক রাষ্ট্রদর্শন বা আদর্শিক ভিত্তির উল্লেখ নেই।
✅ উল্লেখযোগ্য কিছু দফা:
দফা ১: অন্তঃসারশূন্য সংসদ বাতিল করে জনগণের সরকার গঠন
দফা ২: নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন
দফা ৫: দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন
দফা ৯: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
দফা ১৫: রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর সংস্কার
দফা ১৮: প্রবাসীদের ভোটাধিকার
দফা ২১: পরিবেশ সংরক্ষণ
দফা ২৯: তথ্য অধিকার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন
➡️ কিন্তু কোথাও নেই:
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ শব্দটি
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে উল্লিখিত মূলনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা
রাষ্ট্রীয় পরিচয় বা আদর্শ ভিত্তিক বৈপ্লবিক ঘোষণা
জাতীয় চেতনা বা রাষ্ট্রদর্শনের ভবিষ্যৎ কাঠামো
—
⚠️ এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ও আদর্শিক শূন্যতা
(১) রাষ্ট্রদর্শনহীন কর্মতালিকা:
৩১ দফা অনেকটাই একটি প্রশাসনিক সংস্কার প্যাকেজের মতো উপস্থাপিত। তাতে রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝে আদর্শিক বন্ধন গড়ে তোলার কোন কৌশল নেই। ফলে “রাষ্ট্র গঠনের দর্শন” অনুপস্থিত থেকে গেছে।
(২) দলের আদর্শিক পরিচয়ের অপমৃত্যু:
যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ১৯৭৮ সালে বিএনপির জন্মদর্শন ছিল, এবং যার উপর ভিত্তি করে দলটি বাঙালি জাতিয়তাবাদের একমুখী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে, তার কথা পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্ম বা জনগণ বুঝতেই পারছে না বিএনপির ভেতরকার ঐতিহাসিক আদর্শটি কী ছিল বা আজও কতটা প্রাসঙ্গিক।
৪. জিয়াউর রহমানের নৈতিক উত্তরাধিকার অস্বীকার:
তারেক রহমান নিজেকে জিয়াউর রহমানের আদর্শিক উত্তরসূরি হিসেবে দাবি করলেও, তার ঘোষিত দফাগুলোতে সে উত্তরাধিকার কেবল নামমাত্র ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে ‘জিয়া’-কে স্মরণ করলেও আদর্শিকভাবে তাঁকে অস্বীকার করা হয়েছে।
৫. খালেদা তারেকের হাতে জিয়ার আদর্শের কবর রচিত হয়:
তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখা প্রমাণ করে যে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব রাষ্ট্রচিন্তার বদলে ক্ষমতা-কেন্দ্রিক সংস্কারে বেশি আগ্রহী। একটি দলের কেবল প্রশাসনিক সংস্কার দিয়ে জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ সম্ভব নয়, যদি না তার পেছনে থাকে একটি শক্তিশালী আদর্শিক কাঠামো।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল সেই কাঠামো, যা আজ খোয়া গেছে। ৩১ দফার ভাষ্য থেকে তার স্পষ্ট অনুপস্থিতি বোঝায়—বিএনপি এখন জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, বরং কেবল পারিবারিক নাম ব্যবহারকারী এক শূন্য আদর্শের বাহক। এভাবেই খালেদ জিয়া ও তারেক রহমানের হাতে জিয়াউর রহমানের আদর্শ ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কবর রচিত হয়েছে।