বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৬ অপরাহ্ন
১. ভূমিকা :
জগদ্দল পাথরের মতো জমাট বাঁধা রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে যখন জনতার স্রোত এগিয়ে আসে, তখন ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে—গণ-অভ্যুত্থান কখনোই বিদ্যমান সংবিধানের কঠোর পরিখা মেনে চলে না। কারণ সংবিধান সাধারণত সেই শাসনব্যবস্থাই রক্ষা করে, যার বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ করেছে। ফলে অভ্যুত্থানের পরপরই দেশগুলোতে যে পথ অনুসরণ করা হয়, তা হলো বিপ্লবী সরকার গঠন, ঘোষণাপত্র প্রণয়ন, জাতীয় সনদ তৈরি, এবং সর্বশেষে Constituent Assembly-এর মাধ্যমে নতুন সংবিধান রচনা।
২. বিপ্লবের স্বীকৃতি ও দায়মুক্তি— ইতিহাসের অনিবার্যতা :
বিপ্লব সফল হলে বিপ্লবী সরকার জনগণের পক্ষে প্রথম যে কাজটি করে, তা হলো—
অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি ঘোষণা,
বিপ্লবীদের স্বীকৃতি প্রদান,
তাদের বিরুদ্ধে পূর্বতন রাষ্ট্রের দায়-অভিযোগ থেকে পূর্ণ দায়মুক্তি নিশ্চিত করা,
এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশ সুনির্দিষ্ট করা।
এ কারণেই বিশ্বের বহু গণ-অভ্যুত্থানের পর ঘোষণাপত্র ও জাতীয় সনদ তৈরি হয়। সনদের ভিত্তিতেই গঠিত হয় Constituent Assembly, যার প্রধান দায়িত্ব:
“ন্যায়সংগত বিদ্রোহের চেতনায় দেশ পুনর্গঠনের নতুন সংবিধান রচনা।”
৩. জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যা ঘটলো :
এখান থেকেই সমস্যার শুরু।
(১) বিপ্লবী সরকার নয়, গঠিত হলো ‘অন্তর্বর্তী’ সরকার:
রাষ্ট্রবিপ্লবের পর সাধারণত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে বিপ্লবী সরকার দায়িত্ব নেয়।
কিন্তু জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর গঠিত হলো Interim Government—যা কার্যত পূর্ববর্তী সাংবিধানিক কাঠামোরই ধারাবাহিকতা বজায় রাখল।
এতে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হলো—
ক. বিপ্লবকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো না।
খ. বিপ্লবীদের দায়মুক্তি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো কাঠামো তৈরি হলো না।
(২) জুলাই সনদেও বিপ্লবের ন্যায়সংগততা ও দায়মুক্তির কোনো ধারা নেই:
জাতীয় সনদ সাধারণত একটি নৈতিক ও আইনি সেতু—
অতীতের পতিত শাসনব্যবস্থাকে অকার্যকর ঘোষণা করে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা দেয়।
কিন্তু জুলাই সনদ—
বিপ্লবের স্বীকৃতি দেয়নি,
বিপ্লবীদের দায়মুক্তি দেয়নি,
নতুন সংবিধান প্রণয়নের স্পষ্ট ধাপ নির্ধারণ করেনি।
ফলে সনদটি পরিচালন নির্দেশিকা হয়ে রইল, কিন্তু বিপ্লবের ঘোষণা হয়ে উঠল না।
(৩) Constituent Assembly গঠনের প্রশ্ন ধোঁয়াশায়:
বিপ্লবের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হলো—নতুন সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদ গঠন।
কিন্তু জুলাই পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামোতে এ বিষয়ে—
কোনো রোডম্যাপ নেই,
কোনো সময়সীমা নেই,
কোনো জাতীয় আলোচনা নেই।
এটি বিপ্লব-উত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠনকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার হাতে সমর্পণ করেছে।
(৪) জনভোটের পরিবর্তে জাতীয় নির্বাচন—ঝুঁকিতে বিপ্লবী নেতৃত্ব:
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে জনভোট প্রয়োজন ছিল, তা আয়োজন না-করে সরাসরি জাতীয় নির্বাচনের পথে যাওয়া হয়েছে।
এর ফলে—
বিপ্লব-উত্তর শাসনকে জনগণের সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হলো না,
সনদটি সাংবিধানিকভাবে বৈধতা পেল না,
নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার এলেও তার ভিত্তি ‘সাংবিধানিক শূন্যতায়’ দাঁড়িয়ে গেল।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—
বিপ্লবের নায়করা এখন আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের মুখোমুখি হবার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
অতীতের ক্ষমতার ধারাবাহিকতা যদি ফিরে আসে, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানকে “অবৈধ বিদ্রোহ” হিসেবে চিহ্নিত করার পথ তৈরি হয়ে গেছে।
(৫) অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও ঝুঁকিতে:
প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে—
নিজ সরকারের আইনি ভিত্তি ছাড়াই
কোনো সাংবিধানিক সুরক্ষা ছাড়াই
দায়মুক্তি ছাড়া
বিদায় নেবেন।
অর্থাৎ তারা নিজেরাই এমন একটি অনিশ্চিত অবস্থায় আছেন, যেখানে ভবিষ্যৎ সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া তাদের কোনো সুরক্ষা থাকবে না।
এটি এক কথায় স্বেচ্ছায় ঝুঁকির পথে হাঁটা।
৪. ভুল পথে পরিচালিত এক জাতি:
জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল জনতার বিজয়ের মুহূর্ত, কিন্তু অভ্যুত্থানোত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে—
বিপ্লবী ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি,
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মৌলিক রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হয়নি,
নতুন সংবিধানের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে,
আর বিপ্লবের নায়করা রয়ে গেছেন অনিশ্চয়তার ছায়ায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে—
“বিপ্লব যদি আইনগত স্বীকৃতি না পায়, তাহলে বিপ্লবীরাই অপরাধীর ঝুঁকিতে পড়ে।”
৫. বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে:
একদিকে নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি,
অন্যদিকে বিপ্লবের চেতনার অসম্পূর্ণতা—
জাতি দাঁড়িয়ে আছে এমন এক পথের উপর, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎকে আবারও অনিশ্চয়তার গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।