বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৮ অপরাহ্ন
১. ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন :
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। শহীদের রক্ত, তরুণদের আত্মত্যাগ এবং জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের। এ অভ্যুত্থানের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল—একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে থাকবে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই বিপ্লবী লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হন। বিশেষত, বিপ্লবের ২ প্রতিনিধি উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত হওয়ার পরও জাতি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখতে পায়নি। বরং প্রশ্ন জেগেছে—তারা জাতিকে আসলে কী দিলেন?
২. উপদেষ্টা পরিষদে ২ প্রতিনিধি জাতিকে কী দিয়েছেন :
বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে জুলাই বিপ্লবের দুইজন প্রতিনিধি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের মাঝে নতুন আশা তৈরি হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল, এই দুইজনের মাধ্যমে বিপ্লবের চেতনা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে।
তাদের অবদান সীমিত কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ছিল:
(১). কিছু প্রশাসনিক সংস্কার প্রস্তাব: তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দুর্নীতি দমন ও শিক্ষাখাতে সংস্কারের কয়েকটি খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছিল।
(২). বঞ্চিত শ্রেণির কথা তোলা: শ্রমিক, ছাত্র এবং শহীদ পরিবারের ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে আলোচনা উত্থাপন করেছিলেন।
(৩). কিছু স্বল্পমেয়াদি স্বচ্ছতা উদ্যোগ: সরকারী টেন্ডার ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
তবে এই সীমিত অবদান বাস্তবায়ন হয়নি কার্যকরভাবে; প্রস্তাবগুলো ফাইলবন্দী অবস্থায় থেকে যায়।
৩. জাতিকে কী দিতে ব্যর্থ হলেন:
উপদেষ্টা পরিষদে থাকার পরও তারা যে মৌলিক দায়িত্বগুলো জাতিকে দিতে পারেননি, সেগুলো হলো—
(১)গণপরিষদ গঠনা হওয়া: জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি গণপরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে বিপ্লবের নীতিমালা তথা নতুন সংবিধান প্রণয়ন হবে। কিন্তু তা হয়নি।
(২) জুলাই সনদ প্রণয়ন না হওয়া: বিপ্লবের শহীদদের রক্তে রচিত একটি সর্বজনীন নীতিচুক্তি ঘোষণার দাবি ছিল সর্বত্র। তা উপেক্ষিত হয়েছে।
(৩) অন্তর্বর্তী সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত না করা: সরকারের সিদ্ধান্তে তাদের কার্যকর প্রভাব ছিল না; ফলে তারা জাতিকে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন দিতে পারেননি।
(৪) অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া: দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তন—এসব ছিল জনতার দাবি, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।
৪. ফেব্রুয়ারি নির্বাচন: দায় এড়ানোর চেষ্ট:
ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ করতে চাইলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—
বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই নির্বাচন কতটা অর্থবহ?
জনগণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটির মূল কাজ কি কেবল নির্বাচন আয়োজন?
ফলে এ নির্বাচন জনগণের কাছে দায় এড়ানোর প্রচেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
৫. ড. ইউনূস ও দুই উপদেষ্টার যৌথ দায়:
অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা কেবল ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত দায় নয়। প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদে থাকা দুইজনও দায় এড়াতে পারেন না। কারণ—
(১). তারা জনগণের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে নীতিনির্ধারণে বসেছিলেন।
(২). তারা প্রতিবাদ জানাতে বা পদত্যাগ করে জাতির সামনে সত্য প্রকাশ করতে পারতেন।
(৩). বরং তারা থেকে গিয়ে ব্যর্থ সরকারের অংশীদার হয়ে পড়েছেন:
(৪)ফলে প্রশ্ন জেগেছে: তারা জাতিকে কী দিলেন—শুধু আশাভঙ্গ ও হতাশা ছাড়া?
৬. ক্ষতি কি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব :
ড. ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদের ব্যর্থতা জাতিকে দিয়েছে—
আস্থাহীনতা,
রাজনৈতিক শূন্যতা,
বিপ্লবী সম্ভাবনার অপচয়।
এই ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে ইতিহাস বলে—অসম্পূর্ণ বিপ্লব নতুন বিপ্লবের জন্ম দেয়। সুতরাং জুলাই বিপ্লবের চেতনা নতুনভাবে জাগ্রত হওয়াই একমাত্র পথ।
৭. ব্যর্থ সরকারের নীরব অংশীদার :
জুলাই বিপ্লবের ২ প্রতিনিধি উপদেষ্টা পরিষদে থাকা সত্ত্বেও, তারা জাতিকে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দিতে পারেননি। তাদের সীমিত প্রস্তাব জনগণের কাছে কোনো বাস্তব সুফল আনেনি। বরং তারা ব্যর্থ সরকারের নীরব অংশীদার হয়ে ইতিহাসে নিজেদের দায়ী করে তুলেছেন।
অন্যদিকে, ড. ইউনূস নির্বাচন আয়োজন করে হয়তো প্রশাসনিক দায়িত্ব শেষ করেছেন, কিন্তু ইতিহাসের দায় থেকে তিনি মুক্ত নন। জনগণের রক্তে লেখা বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন না করে ক্ষমতা ছাড়ার দায় ইতিহাস একদিন কঠোরভাবে তার কাছ থেকে প্রশ্ন করবে:
“আপনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু জাতিকে কী দিলেন?”