বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন
১. প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক রূপান্তরের দাবির প্রতীক। এ আন্দোলনের অন্যতম মূল দাবি ছিল একটি “জুলাই সনদ” প্রণয়ন, যা জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশ্যও ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে একই টেবিলে বসিয়ে সনদ-ভিত্তিক সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন এবং রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠন নিশ্চিত করা। আন্দোলনের সমর্থকরা বিশ্বাস করতেন, জুলাই সনদ হবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তী সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক চুক্তি।
—
২. প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
প্রথমে জনগণের কাছে যে ধারণা তৈরি করা হয়েছিল তা হলো—
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে জুলাই সনদ তৈরি করবে।
সনদের ভিত্তিতেই নতুন সংবিধান প্রণীত হবে।
সংস্কার, নির্বাচন ও প্রশাসনিক রূপান্তরের সব পদক্ষেপ জুলাই সনদ অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
কিন্তু ৫ আগস্টের পরে বাস্তব চিত্র ভিন্ন দিকে মোড় নেয়—
প্রধান উপদেষ্টা সেদিন হঠাৎই “জুলাই ঘোষণাপত্র” পাঠ করেন, যা সনদ থেকে আলাদা ও অনেক দিক থেকে বিতর্কিত।
একই রাতে তিনি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকে।
—
৩. বিচ্যুতির মূল ইঙ্গিত
এই আচরণ কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন ও আশঙ্কা উত্থাপন করে—
1. সনদ পাশ কাটানোর উদ্দেশ্য
জুলাই সনদকে উপেক্ষা করে সরাসরি নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া আসলে কি আন্দোলনের মূল চেতনা ভেঙে দেওয়া নয়?
এতে গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা কি কার্যত বাতিল হলো?
2. গণআস্থার সংকট
কমিশন নীরব থাকার ফলে জনমনে সন্দেহ জন্মেছে যে, ঐকমত্যের প্রচেষ্টা আসলে ছিল সময়ক্ষেপণ ও রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার কৌশল।
3. রাজনৈতিক বিভাজন কৌশল
বিএনপি ছাড়া অন্য দলগুলো এখনো ফাঁদে না পড়লেও, এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মাঠে বিভাজন তৈরির হাতিয়ার হতে পারে।
—
৪. সম্ভাব্য প্রভাব
গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার ক্ষয়
সনদ ছাড়া নির্বাচন মানে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য—সংস্কার, জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য—প্রায় হারিয়ে ফেলা।
জনগণের আস্থা ভাঙন
আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছে, তাদের আত্মত্যাগ রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের পণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা
সনদ বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে বিজয়ী যে-ই হোক, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে, যা ভবিষ্যতে নতুন সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
—
৫. উপসংহার
‘জুলাই সনদ’ বাদ দিয়েই নির্বাচনের তোড়জোড় কেবল একটি প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন নয়—এটি গণ-অভ্যুত্থানের মূল চুক্তি থেকে সরে আসার প্রকাশ্য ঘোষণা। এর মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এমন এক রাজনৈতিক রাস্তায় হাঁটছেন, যা জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে এবং ইতিহাসের চোখে এক প্রকার প্রতারণা হিসেবে লিপিবদ্ধ হতে পারে।
রাষ্ট্রের জন্য ন্যূনতম শর্ত হওয়া উচিত—সংস্কার ও নির্বাচনের ভিত্তি হবে গণ-অভ্যুত্থানের রক্তে লেখা সনদ।
না হলে ৫ আগস্টের বিজয় কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, আর জনগণের হাতে থাকবে না কোনো স্থায়ী পরিবর্তনের স্বপ্ন।
——-