বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ন
১. বিপ্লবোত্তর প্রত্যাশা :
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। রক্তে ভেজা সেই বিপ্লবের পর দেশের মানুষ অপেক্ষা করছিল বৈপ্লবিক রাষ্ট্রকাঠামোর পুনর্গঠনের। স্বপ্ন ছিল—দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলে নতুন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তখনই সামনে এসেছিলেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস। দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল—তিনি হবেন নতুন বাংলাদেশের স্থপতি, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপকার।
২. হারানো সুযোগ :
কিন্তু ইতিহাসের এই সুযোগ কাজে লাগাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যদি তিনি সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করতেন, গণভোটের মাধ্যমে অভ্যুত্থানকে গণভিত্তি ও আইনিভিত্তি দিতেন, পর্যায়ক্রমে জুলাই সনদ ঘোষণা করে একটি Constituent Assembly নির্বাচন আয়োজন করতেন, এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে পরিবারতন্ত্রের চির অবসান ঘটাতেন—তাহলে ইউনূস হয়তো হয়ে উঠতেন বাংলাদেশের “counter-reformation”-এর জনক।
বরং তিনি বেছে নিলেন সময়ক্ষেপণ। একের পর এক কমিশন গঠন করে বছরাধিক কাল কাটিয়ে দিলেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খাতায় কলমে। প্রতিশ্রুত রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন বাস্তবায়নের পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত তিনি পিছিয়ে গেলেন।
৩. বিপ্লবের চেতনার ক্ষয় :
গত এক বছরে ড. ইউনূসের এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান মানুষের ভেতরকার উত্তেজনা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করেছে।
সংগঠিত ছাত্র-যুব সমাজ যারা জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির সৈনিক ছিল, তারাই আজ বিভ্রান্ত ও নিরাশ। তাদের মনে প্রশ্ন—যে রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য তারা রক্ত দিয়েছে, তা কি আবার পুরনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতে চলে যাচ্ছে?
মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা বিপ্লবকে গণতান্ত্রিক সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল, তারা কমিশন-নির্ভর শাসন কাঠামোর অনন্ত সময়ক্ষেপণে আশাহত হয়ে পড়েছে।
গ্রামীণ সাধারণ মানুষ, যারা দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসান চেয়েছিল, তারা দেখতে পাচ্ছে পুরনো দলগুলোরই পুনরুত্থান—ফলে নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, একসময়ের জাগ্রত চেতনা এখন প্রশ্নবিদ্ধ, এবং এর দায় এড়াতে পারেন না নেতৃত্বে থাকা ড. ইউনূস।
৪. লণ্ডনের নাটকীয় সমঝোতা :
পরিস্থিতির মোড় ঘুরল আরও নাটকীয়ভাবে। লন্ডন সফরে গিয়ে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান। সেই সমঝোতার ফল একটি যৌথ ঘোষণা—যার পথ ধরে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সমঝোতা দেখিয়ে দিলো—বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা ক্রমশ দলীয় সমঝোতা ও নির্বাচনী কারচুপির রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
৫. আস্থা ভাঙনের রাজনীতি :
জাতির ভরসাস্থল হিসেবে দেখা হলেও, এই রাজনৈতিক ডিগবাজি মানুষের আস্থা ভেঙে দিয়েছে।
বিপ্লবের শহীদ পরিবারগুলো মনে করছে, তাদের আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক দরকষাকষির টেবিলে বিক্রি করে দেওয়া হলো।
আদর্শবাদী ছাত্রনেতারা হতাশার সঙ্গে বলছে, বিপ্লবের ডাক শুধু ক্ষমতার চক্র ঘোরানোর কাজে ব্যবহার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলও দেখছে—ড. ইউনূস যেখানে সংস্কারক হবার সুযোগ পেয়েছিলেন, সেখানে তিনি সমঝোতার খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছেন।
৬. উপসংহার :
যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ ছিল, তা তার হাতেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে—যিনি হতে পারতেন নতুন বাংলাদেশের রূপকার, তিনি কি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার প্রতীক হয়েই ইতিহাসে স্থান নেবেন?

আধ্যাপক, এম এ বার্নিক