বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন
১। বঙ্গোপসাগরে জাপানের ভূকৌশলের পটভূমি*:
আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো Free and Open Indo-Pacific (FOIP) বা মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত ধারণা। এটি মূলত জাপানের উদ্যোগে বিকশিত একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো, যার লক্ষ্য ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধ নৌ চলাচল, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, মুক্ত বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ২০০৭ সালে ভারতের সংসদে ‘Confluence of the Two Seas’ শীর্ষক ঐতিহাসিক বক্তব্যে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিসর হিসেবে দেখার ধারণা তুলে ধরেন। ২০১৬ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত TICAD সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে Free and Open Indo-Pacific ধারণাকে জাপানের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে সামনে আনেন।
এ কৌশলের মূল দর্শন হলো—কোনো রাষ্ট্রের একক আধিপত্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা।
*২. চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ও FOIP-এর কৌশলগত গুরুত্ব*:
ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ, আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য, প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থা এবং সামরিক কৌশলগত অবস্থান এ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), দক্ষিণ চীন সাগরে তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রপথের স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় সহযোগিতা বাড়িয়েছে। এ চার দেশের সমন্বিত কাঠামো Quad নামে পরিচিত।
তবে FOIP এবং Quad এক বিষয় নয়। FOIP একটি বৃহত্তর কৌশলগত দর্শন ও সহযোগিতার কাঠামো; অন্যদিকে Quad চারটি দেশের একটি সহযোগিতামূলক ফোরাম। FOIP-কে সরাসরি চীনবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথার্থ হবে না। এর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত ও উন্নয়ন সহযোগিতার দিকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
*৩. ২০২৬ সালে FOIP-এর নতুন বিবর্তন*:
জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ২০২৬ সালের ২ মে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক বক্তব্যে FOIP-এর হালনাগাদ রূপরেখা ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ১২ অক্টোবর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘The Updated Free and Open Indo-Pacific’ প্রকাশ করে।
নতুন রূপরেখায় তিনটি অগ্রাধিকার বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
*প্রথমত*, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করা।
*দ্বিতীয়ত*, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যৌথ উদ্যোগ: সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ, অবাধ বাণিজ্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন।
*তৃতীয়ত*, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা: সামুদ্রিক নিরাপত্তা, উপকূলীয় নজরদারি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা।
এখানে লক্ষণীয় যে, নতুন FOIP শুধু সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
*৪. তারেক রহমানের জাপান সফর: FOIP বাস্তবায়নে বাংলাদেশের গুরুত্ব*
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬–২৯ অক্টোবর ২০২৬-এর জাপান সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে টোকিওতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
জাপানের সরকারি বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশকে হালনাগাদ FOIP বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা (Autonomy) এবং জাতীয় সক্ষমতার স্থিতিস্থাপকতা (Resilience) জোরদারে জাপানের সমর্থনের কথাও জানান।
এ বক্তব্যের কূটনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ বাংলাদেশকে শুধু একটি উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তর কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
*৫. BIG-B থেকে BIG-B for Shared Prosperity: নতুন কৌশলগত উদ্যোগ*
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি হলো বিদ্যমান Bay of Bengal Industrial Growth Belt (BIG-B) উদ্যোগকে উন্নীত করে ‘BIG-B for Shared Prosperity’ নামে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত।
এ উদ্যোগের চারটি স্তম্ভ হলো—
(১). যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ জোরদার।
(২). প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি।
(৩). সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি।
(৪). আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
এ পরিকল্পনায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, নৌপথ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ও শিল্পায়ন ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মাতারবাড়ী, চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি আঞ্চলিক শিল্প ও লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলা সম্ভব হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুতে পরিণত হতে পারে।
*৬. এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা*:
জাপানের প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। জাপানের সরকারি বিবৃতিতে এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-জাপান Economic Partnership Agreement (EPA) দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। এর ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
*৭. সামুদ্রিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশের নতুন দায়িত্ব ও সম্ভাবনা*:
FOIP-এর নতুন রূপরেখায় সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য জাপানের টহলজাহাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বঙ্গোপসাগরে অবৈধ মাছ শিকার, মানবপাচার, চোরাচালান, জলদস্যুতা এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের বিষয়।
জাপানের এ সহযোগিতা বাংলাদেশের সামুদ্রিক নজরদারি ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ সহযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের নিজস্ব সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়া নয়।
*৮. বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ*
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। কীভাবে জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব বাড়ানো যায়, একই সঙ্গে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়?
চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত অংশীদার। ভারত নিকটতম প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার ও আন্তর্জাতিক অংশীদার। জাপান বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার অন্যতম প্রধান উৎস।
সুতরাং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বাধীনতা।
FOIP-এ অংশীদারত্ব মানেই কোনো সামরিক জোটে যোগদান নয়। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক সহযোগিতার সুযোগ গ্রহণ করতে হবে।
*৯. বঙ্গোপসাগর হতে পারে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ*
তারেক রহমানের জাপান সফর এবং BIG-B for Shared Prosperity উদ্যোগের ঘোষণা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসম্পদ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জনশক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা দেশটিকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল কূটনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ কূটনীতি, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সামুদ্রিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ হলো—বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না হয়ে, তাদের মধ্যে সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে পরিণত হওয়া।
বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ যদি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে পারে, তাহলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বিন্যাসে দেশটি শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নয়, নিজস্ব সক্ষমতা ও কৌশলগত প্রজ্ঞার কারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
*( লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সময়ের সাহসী পর্যবেক্ষক)*