বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন
১. জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন এক বিপ্লবী আদর্শের প্রবর্তক। তিনি যেভাবে “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর ভিত্তিতে একটি আত্মনির্ভর, স্বকীয় ও স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপরেখা দিয়েছিলেন, তা ছিল তৎকালীন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দৃষ্টান্তমূলক। অথচ তারই উত্তরসূরী তারেক রহমান, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সূত্রে হলেও, আদর্শিক উত্তরাধিকার বহন করেননি—বরং জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার বহু মৌলিক স্তম্ভকেই খণ্ডন করে তার নিজস্ব ৩১ দফা উপস্থাপন করেছেন। এর ফলে জিয়া-তারেক দ্বন্দ্ব শুধু প্রজন্মগত নয়, এটি এক গভীর রাষ্ট্রদর্শনগত সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
২. জিয়ার ১৯ দফা বনাম তারেকের ৩১ দফা: মূলমন্ত্রে সংঘাত:
জিয়াউর রহমান ১৯ দফায় যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা ছিল—
জাতীয় ঐক্য,
আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি,
ধর্মীয় মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ,
বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদাশীল কূটনীতি,
ভূমিসংস্কার ও কৃষক-শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্রনীতি।
এর বিপরীতে তারেক রহমানের ৩১ দফা মূলত প্রশাসনিক সংস্কার, দপ্তর পুনর্বিন্যাস, এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। সেখানে জাতীয়তাবাদ, ইসলাম, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে কোনো উচ্চারণ নেই। অর্থাৎ, তারেকের ৩১ দফা একপ্রকারে জিয়ার ১৯ দফার চেতনাবিরোধী এবং নির্জীব কাগুজে সংস্কার তালিকায় পরিণত হয়েছে।
৩. মুক্তবাজার অর্থনীতি বনাম রাষ্ট্রনির্ভর সমাজনীতি :
জিয়া চেয়েছিলেন স্বদেশি শিল্প, কৃষি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর ভর করে একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র গঠন করতে। অথচ তারেক রহমান মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ নির্ভর উদারপন্থার দিকে ধাবিত হয়েছেন, যেখানে বাজারই নিয়ন্ত্রক, রাষ্ট্র নয়। ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, কৃষকের জমি বেসরকারিকরণ, ও বিদেশি বিনিয়োগের নামে সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বিদেশি সংস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
এটি শুধু জিয়ার আদর্শের সাথে বিরোধ নয়, বরং বাংলাদেশি স্বার্থবিরোধী এক কর্পোরেট ধারা—যেখানে জনগণ নয়, গুটিকয় কোম্পানি ও বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাই মূল নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠছে।
৪. আদর্শনির্ভর নেতৃত্ব বনাম প্রশাসনিক প্যাকেজিং :
জিয়ার রাজনীতি ছিল মূলত আদর্শিক। তিনি বাংলাদেশকে ইসলামী মূল্যবোধ, জাতীয় সংস্কৃতি ও আত্মনির্ভর রাজনীতির ভিত্তিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তারেক রহমানের রাজনীতি আদর্শশূন্য “নির্বাচনযোগ্য প্যাকেজ” তৈরির এক প্রচেষ্টা মাত্র। তিনি প্রশাসনিক চমক, কাগুজে পরিকল্পনা এবং ইমেজ নির্মাণে সময় দেন; অথচ জনতার বাস্তব সংগ্রাম, সামাজিক মূল্যবোধ, অথবা জাতির মৌলিক সমস্যা নিয়ে তার অবস্থান নীরব বা কৌশলগত।
৫. ভারত ও আন্তর্জাতিক অবস্থান: আত্মমর্যাদা বনাম নির্ভরতামূলক রাজনীতি :
জিয়া চেয়েছিলেন ভারতীয় আধিপত্যের বাইরে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে—যার ফলাফল ছিল ওআইসি, নন-অ্যালাইন্ড মুভমেন্টে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক-মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিকল্প জোট রাজনীতি।
তারেক রহমান স্পষ্টভাবে দিল্লি-ওয়াশিংটন ঘেঁষা অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে ভারতের আধিপত্য প্রশ্নে নীরবতা এবং পশ্চিমা আর্থিক সংস্থার শর্ত মেনে নেওয়াই তার বাস্তব কূটনীতির প্রকাশ। এতে তার জাতীয়তাবাদী পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
৬. বিএনপির চরিত্র: আদর্শনিষ্ঠ দল থেকে পরিবারতন্ত্রে রূপান্তর :
জিয়াউর রহমান দল গঠন করেছিলেন আদর্শনিষ্ঠ, সংগঠনভিত্তিক, জনগণমুখী দল হিসেবে। কিন্তু তারেক রহমান সেই দলকে পরিবারতন্ত্র, লন্ডনভিত্তিক ভার্চুয়াল নেতৃত্ব, এবং কেন্দ্রীয়করণে রূপান্তর করেছেন। দলের আদর্শ নয়, এখন প্রাধান্য পাচ্ছে ক্ষমতার উত্তরাধিকার ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুগত্য।
৭. বিএনপি’র আদর্শহীনতার ভয়াবহ পরিণতি :
তারেক রহমান তার ৩১ দফা ও বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শনের প্রায় প্রতিটি স্তম্ভে আঘাত করেছেন। এটি শুধু একটি পিতাপুত্রের প্রজন্মগত পার্থক্য নয়, বরং এক ঐতিহাসিক আদর্শিক বিপর্যয়—যার ফলে বিএনপি নিজেকে জাতীয়তাবাদী পরিচয় থেকে বিচ্যুত করে ফেলেছে। ইতিহাস হয়তো একদিন বলবে—
জিয়াউর রহমানের সুপ্রতিষ্ঠিত “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” রাষ্ট্রদর্শনকে পুরোপুরি মুছে দিয়েছেন জিয়ার রক্তসূত্রে উত্তরাধিকারী তারেক রহমান নিজেই।
————————————-