শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ন
ভূমিকা
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে কমিউনিটি রেডিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক উদ্যোগ। এটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরা, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
বাংলাদেশে এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দীর্ঘ আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হলো Bangladesh NGOs Network for Radio and Communication—BNNRC এবং এর প্রতিষ্ঠাতা/প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান। FAO-এর নথিতেও এএইচএম বজলুর রহমানকে BNNRC-এর প্রতিষ্ঠাতা সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কমিউনিটি ফার্ম ব্রডকাস্টিং বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
—
১. ২০০০ সাল থেকে একটি দীর্ঘ নাগরিক আন্দোলনের সূচনা
BNNRC ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও ও কমিউনিটি মিডিয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে আসছে। সংগঠনটি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে advocacy বা নীতিগত সংলাপ চালিয়েছে।
এএইচএম বজলুর রহমানের নেতৃত্বে BNNRC-এর মূল বক্তব্য ছিল—গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী শুধু রাষ্ট্রীয় বা বাণিজ্যিক গণমাধ্যমের শ্রোতা থাকবে না; তাদের নিজেদের প্রয়োজন, ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে নিজেদের গণমাধ্যমও থাকা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সূত্রেও উল্লেখ রয়েছে যে, ২০০০ সাল থেকে BNNRC অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে সরকারের কাছে কমিউনিটি রেডিওর পক্ষে ধারাবাহিক advocacy চালিয়ে আসছিল।
—
২. ২০০৮ সালের কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা—একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক
দীর্ঘদিনের advocacy-এর অন্যতম বড় সাফল্য আসে ২০০৮ সালে।
তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয় Community Radio Installation, Broadcast and Operation Policy 2008 ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনার জন্য একটি সরকারি নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়।
এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। কারণ এর আগে বাংলাদেশের সম্প্রচারব্যবস্থা মূলত রাষ্ট্রীয় ও সীমিত বেসরকারি সম্প্রচারের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। ২০০৮ সালের নীতিমালা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের জন্য একটি নতুন সম্প্রচার-দিগন্ত খুলে দেয়।
এখানে BNNRC-এর ভূমিকা ছিল মূলত নীতিগত advocacy, সচেতনতা সৃষ্টি, বিভিন্ন অংশীজনকে সংগঠিত করা এবং সম্ভাব্য উদ্যোগকারীদের সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান।
—
৩. এএইচএম বজলুর রহমানের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব
এএইচএম বজলুর রহমানের অবদানকে শুধু একটি এনজিওর প্রশাসনিক নেতৃত্ব হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণতা পাওয়া যায় না।
তিনি কমিউনিটি রেডিওকে বাংলাদেশের grassroots communication, participatory development এবং right to information-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
তার বিভিন্ন লেখা ও উপস্থাপনায় কমিউনিটি রেডিওকে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে জনগণ শুধু শ্রোতা নয়—তারা অনুষ্ঠান নির্মাণ, মতামত প্রকাশ এবং স্থানীয় উন্নয়ন আলোচনার অংশীদার।
এ কারণে তার নেতৃত্বে BNNRC দীর্ঘ সময় ধরে সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি policy bridge হিসেবে কাজ করেছে।
—
৪. সরকারি অনুমোদন থেকে বাস্তব সম্প্রচার
২০০৮ সালের নীতিমালার পর বিষয়টি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
২০১০ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও স্থাপন ও পরিচালনার জন্য একাধিক উদ্যোগকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রথম পর্যায়ে ১২টি উদ্যোগকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। BNNRC বিভিন্ন সম্ভাব্য উদ্যোগকারী প্রতিষ্ঠানকে আবেদন প্রক্রিয়া, প্রযুক্তিগত বিষয়, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও নীতিমালা সম্পর্কে সহায়তা দেয়।
একটি গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, BNNRC-এর National Help Desk-এর মাধ্যমে প্রায় ২০০টি সংগঠনকে কমিউনিটি রেডিওর আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
এটি BNNRC-এর বাস্তব অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
—
৫. তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এবং কমিউনিটি রেডিও
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদে কমিউনিটি রেডিও নামে পৃথক কোনো আইন পাস হয়নি।
তবে কমিউনিটি রেডিওর বিকাশের সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সম্পর্ক রয়েছে।
২০০৯ সালের ২৯ মার্চ নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ পাস হয়।
এই আইনের মূল দর্শন হলো জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা।
কমিউনিটি রেডিও সেই তথ্য অধিকারকে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ,
তথ্য অধিকার আইন → তথ্যপ্রাপ্তির নাগরিক অধিকার → স্থানীয় জনগণের তথ্যের প্রয়োজন → কমিউনিটি রেডিও → grassroots information empowerment
এই ধারাবাহিকতার মধ্যে কমিউনিটি রেডিওর তাৎপর্য বোঝা যায়।
BNNRC-ও কমিউনিটি রেডিওকে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে।
—
৬. জাতীয় সংসদের ভূমিকা কোথায়?
জাতীয় সংসদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে হলে “আইন” এবং “নীতিমালা”—এই দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে।
কমিউনিটি রেডিওর মূল অনুমোদন কাঠামো তথ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৮ সালের নীতিমালার পর সরকার ২০১২ সালে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করে। সরকারি নথিতে জাতীয় কৌশলের উদ্দেশ্য হিসেবে ২০০৮ সালের নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের regulator ও facilitator—এই দুই ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদ তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯সহ বৃহত্তর তথ্যপ্রবাহ ও নাগরিক অধিকারের আইনি কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
সুতরাং বলা অধিকতর সঠিক হবে—
কমিউনিটি রেডিওর সরাসরি আইনগত ভিত্তি এসেছে সরকারি নীতিমালা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে; আর জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বৃহত্তর তথ্য অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আইনি পরিবেশ সৃষ্টি করা।
—
৭. ২০১২ সালের জাতীয় কৌশল
২০০৮ সালের নীতিমালাকে কার্যকর করার জন্য সরকার ২০১২ সালে National Strategy for the Implementation of Community Radio Installation, Broadcast and Operations Policy গ্রহণ করে।
এই কৌশলপত্রে কমিউনিটি রেডিওকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের regulator ও facilitator—দুই ধরনের ভূমিকার কথা বলা হয়।
এ পর্যায়ে BNNRC ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর advocacy আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
—
৮. জাতীয় রেগুলেটরি কাঠামো
পরবর্তী নীতিমালায় কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনার জন্য জাতীয় রেগুলেটরি কমিটির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
সরকারি খসড়া নীতিমালায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি, বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সদস্য এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে সদস্য-সচিব করার কাঠামোর উল্লেখ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে নীতিমালা পর্যালোচনা, সংশোধন এবং আইন-বিধি সমন্বয়ের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়।
অর্থাৎ কমিউনিটি রেডিও ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রচারব্যবস্থায় পরিণত হয়।
—
৯. BNNRC-এর আরেকটি বড় অবদান—প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
নীতিমালা তৈরি করলেই কমিউনিটি রেডিও সফল হয় না।
প্রয়োজন—
– স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি;
– রেডিও কর্মী প্রশিক্ষণ;
– অনুষ্ঠান নির্মাণ;
– সাংবাদিকতা;
– প্রযুক্তিগত দক্ষতা;
– স্টেশন ব্যবস্থাপনা;
– স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ;
– নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ;
– দুর্যোগকালীন সম্প্রচার ব্যবস্থা।
BNNRC এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ ও capacity building কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
তাদের কাজের পরিধি বর্তমানে কমিউনিটি রেডিওর পাশাপাশি community media, digital democracy, journalism এবং rural communication পর্যন্ত বিস্তৃত।
—
১০. কমিউনিটি রেডিও কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর, সীমান্তবর্তী এলাকা এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য সবসময় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
কমিউনিটি রেডিও এই জায়গাটিই পূরণ করে।
একটি স্থানীয় রেডিও বলতে পারে—
“আজ নদীর পানি বাড়ছে।”
“ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত কী?”
“কৃষকের ধান কীভাবে রক্ষা করবেন?”
“স্থানীয় হাসপাতালে কোন সেবা পাওয়া যাচ্ছে?”
“জেলে কখন নদীতে যেতে পারবেন?”
“নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিকার কোথায়?”
“সরকারি ভাতা পাওয়ার নিয়ম কী?”
এই কারণে কমিউনিটি রেডিও শুধু broadcasting নয়; এটি local development infrastructure-এর অংশ।
—
১১. দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা
বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা মহামারির সময়ে স্থানীয় ভাষায় দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়া জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
কমিউনিটি রেডিওর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি স্থানীয় মানুষের ভাষায়, স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে, স্থানীয় মানুষের কাছেই তথ্য পৌঁছে দিতে পারে।
এখানে BNNRC-এর advocacy ও capacity-building কাজের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
—
১২. প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর
কমিউনিটি রেডিওর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব হলো “voice of the voiceless” ধারণা।
যে কৃষক ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না,
যে জেলে জাতীয় টেলিভিশনে কথা বলার সুযোগ পান না,
যে নারী স্থানীয় সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন,
যে চরবাসী জাতীয় সংবাদে প্রায় অদৃশ্য—
কমিউনিটি রেডিও তাদের কথা স্থানীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পারে।
এই কারণেই BNNRC কমিউনিটি মিডিয়াকে গণতন্ত্র, অংশগ্রহণ এবং তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছে।
—
১৩. নীতিমালা থেকে আজকের কমিউনিটি রেডিও
২০০৮ সালের নীতিমালা ছিল সূচনা। এরপর ২০১২ সালের জাতীয় কৌশল এবং পরবর্তী সময়ে নীতিমালার সংশোধন ও হালনাগাদ হয়েছে।
বাংলাদেশ বেতারের সরকারি ওয়েবসাইটেও বর্তমানে Community Radio Installation, Broadcast and Operation Policy 2022-এর উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ ২০০৮ সালে যে দরজা খুলেছিল, পরবর্তী বছরগুলোতে সেটিই একটি বিস্তৃত কমিউনিটি মিডিয়া কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
—
১৪. এএইচএম বজলুর রহমানের অবদান—একটি মূল্যায়ন
এএইচএম বজলুর রহমানের অবদানকে মোটামুটি পাঁচটি স্তরে মূল্যায়ন করা যায়—
প্রথমত—Conceptual Leadership:
বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওকে উন্নয়ন, তথ্য অধিকার ও grassroots empowerment-এর সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত—Policy Advocacy:
সরকারের কাছে কমিউনিটি রেডিওর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে নীতিগত পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি advocacy পরিচালনা।
তৃতীয়ত—Institution Building:
BNNRC-কে কমিউনিটি রেডিও ও কমিউনিটি মিডিয়া খাতের একটি জাতীয় networking platform হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
চতুর্থত—Capacity Building:
রেডিও উদ্যোগকারী, সাংবাদিক ও স্থানীয় সম্প্রচারকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা।
পঞ্চমত—Grassroots Empowerment:
প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীকে তথ্যপ্রাপ্তির পাশাপাশি নিজের কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করা।
FAO-এর তথ্যেও BNNRC-কে ২০০০ সাল থেকে সরকার, শিল্পখাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গণমাধ্যম, একাডেমিয়া ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে community electronic media sector-এর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
—
১৫. ইতিহাসের বিচারে BNNRC-এর অবস্থান
বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওর ইতিহাসকে যদি একটি ধারাবাহিকতায় সাজানো হয়, তাহলে চিত্রটি দাঁড়ায়—
২০০০ — BNNRC-এর যাত্রা ও advocacy
↓
২০০০–২০০৭ — কমিউনিটি রেডিওর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নীতিগত প্রচারণা
↓
২০০৮ — Community Radio Installation, Broadcast and Operation Policy
↓
২০০৯ — Right to Information Act
↓
২০১০ — প্রথম দফায় কমিউনিটি রেডিও উদ্যোগের সরকারি অনুমোদন
↓
২০১২ — National Strategy
↓
পরবর্তী সময় — সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষণ, capacity building ও নতুন নীতিমালা
↓
২০২২ — হালনাগাদ Community Radio Policy
এই ধারাবাহিকতায় BNNRC এবং এএইচএম বজলুর রহমানকে বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিও আন্দোলনের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক-সমাজভিত্তিক চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
—
উপসংহার
বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস মূলত রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ইতিহাস।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রায় এএইচএম বজলুর রহমান ও BNNRC-এর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে advocacy, policy dialogue, capacity building এবং grassroots communication-এর ক্ষেত্রে।
এখানে একটি ঐতিহাসিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন—কমিউনিটি রেডিও কোনো একদিনে বা একটি আইন পাসের মাধ্যমে জন্ম নেয়নি। এটি বহু বছরের নাগরিক আন্দোলন, নীতিগত প্রচেষ্টা, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীকালে বাস্তব সম্প্রচারের সম্মিলিত ফল।
জাতীয় সংসদ তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর মাধ্যমে জনগণের তথ্য অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; আর নির্বাহী বিভাগ ২০০৮ সালের কমিউনিটি রেডিও নীতিমালার মাধ্যমে সম্প্রচারের পথ উন্মুক্ত করেছে।
এই দুই ধারার মাঝখানে BNNRC-এর মতো নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং এএইচএম বজলুর রহমানের মতো policy advocate-রা যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে সেটিই তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
সুতরাং, বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিওর ইতিহাস শুধু কয়েকটি রেডিও স্টেশন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি তথ্যের অধিকারকে রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, চর, উপকূল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক দীর্ঘ গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ইতিহাস।