বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন
*১. সাইবার নিরাপত্তা: রাষ্ট্ররক্ষার নতুন ফ্রন্টলাইন*:
এক সময় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলতে বোঝানো হতো সীমান্ত, সেনাবাহিনী ও অস্ত্রভাণ্ডার। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা আমূল বদলে গেছে। আজ সাইবার স্পেস হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রন্টলাইন—যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং, নির্বাচন, প্রতিরক্ষা যোগাযোগ, এমনকি জনমতও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে এই গুরুত্বপূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা ধারণাটি কখনোই রাষ্ট্রীয় কৌশলগত নিরাপত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি।
*২. শেখ হাসিনার শাসনামলে সাইবার নিরাপত্তার ভ্রান্ত দিকনির্দেশনা*:
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে আইসিটি ও সাইবার নিরাপত্তা খাত পরিচালিত হয়েছে এমন কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে, যাদের মধ্যে কৌশলগত সাইবার জ্ঞান, সামরিক-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক সাইবার থ্রেট বোঝার সক্ষমতা ছিল সীমিত বা অনুপস্থিত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
সজীব ওয়াজেদ জয়
সৈয়দ আবুল হোসেন
জুনায়েদ আহমদ পলক
এই ব্যক্তিবর্গের হাতে আইসিটি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে সাইবার নিরাপত্তা রাষ্ট্ররক্ষার কৌশলগত স্তর থেকে নামিয়ে আনা হয় প্রশাসনিক ও আইন-শৃঙ্খলা সমস্যার পর্যায়ে।
*৩. সাইবার নিরাপত্তার নামে মামলা হয়রানি*:
বিশ্বের কোনো আধুনিক রাষ্ট্রে সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু মামলা, গ্রেফতার, ডিজিটাল নজরদারি বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। অথচ বাংলাদেশে—
সাইবার নিরাপত্তা আইন পরিণত হয় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের আইনে
সাইবার ইউনিটগুলো কাজ করে বক্তব্য নজরদারি ও মামলার কারখানা হিসেবে
জাতীয় অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, SCADA সিস্টেম, নির্বাচন সার্ভার—এসব রয়ে যায় প্রায় অরক্ষিত
ফলে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা (Defensive) বা প্রতিআক্রমণ (Offensive) সক্ষমতা তৈরির বদলে পরিণত হয় একটি ভয়ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়।
*৪. Offensive ও Defensive Cyber Capability–অনুপস্থিত রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি*:
একটি রাষ্ট্রের কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি স্তম্ভের উপর—
Defensive Cyber Capability
Critical Infrastructure Protection
Threat Detection & Incident Response
National SOC (Security Operations Center)
Offensive Cyber Capability
Deterrence Strategy
Adversary Capability Mapping
Cyber Warfare Readiness
Strategic Cyber Doctrine
National Cyber Risk Assessment
Inter-agency Coordination
Military–Civil Fusion
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসনামলে এই তিনটির কোনোটিই কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং রাষ্ট্র নিজেই বিভ্রান্ত ছিল—সাইবার নিরাপত্তা কি জাতীয় নিরাপত্তা, না কি পুলিশের একটি শাখা?
*৫. জাতীয় সাইবার ঝুঁকি ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা ধারণার ব্যর্থতা*:
এই ভ্রান্ত চর্চার সরাসরি ফলাফল হলো—
National Cyber Risk কখনো সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়নি
কোনো পূর্ণাঙ্গ National Cyber Security Strategy কার্যকর হয়নি
সাইবার হুমকিকে কখনোই সামরিক ও কৌশলগত হুমকি হিসেবে গণ্য করা হয়নি
আন্তঃমন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় গড়ে ওঠেনি
ফলে বাংলাদেশ আজও জানে না—
কোন সাইবার আক্রমণ রাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি
কোন অবকাঠামো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
যুদ্ধকালীন সাইবার পরিস্থিতিতে কে সিদ্ধান্ত নেবে।
*৬. ভুল পথ থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন*:
সাইবার নিরাপত্তাকে যদি এখনো আইন-শৃঙ্খলা ইস্যু হিসেবে দেখা হয়, তবে ভবিষ্যতে তা হবে রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের কারণ। প্রয়োজন—
সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা,
রাজনৈতিক অনুগত নয়, কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্ব দেওয়া,
একটি পূর্ণাঙ্গ National Cyber Command প্রতিষ্ঠা,
Offensive ও Defensive উভয় সক্ষমতা গড়ে তোলা।
*অন্যথায়*, বাংলাদেশ কেবল ডিজিটাল হবে—কিন্তু নিরাপদ হবে না।