বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন
১. ভূমিকা :
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে “সিনিয়র সিটিজেন” (Senior Citizen) বা প্রবীণ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, কল্যাণমূলক সুবিধা ও আইনি কাঠামো বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সুস্পষ্টভাবে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আইনভিত্তিক সংজ্ঞা এবং সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্তমানে প্রবীণ নাগরিকরা স্বাস্থ্য, আর্থিক নিরাপত্তা, চলাচল ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নানা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
২. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট :
ভারত: ১৯৯৯ সালে “Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act” পাশ করে, যেখানে ৬০ বছর বয়সী নাগরিককে সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তারা করছাড়, ভাড়া কম, স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা ও আশ্রয়কেন্দ্র পান।
সিঙ্গাপুর: “Silver Support Scheme” এর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের প্রবীণদের ভাতা প্রদান করে।
জাপান: প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবীমা, বাসস্থানের ভর্তুকি, সামাজিক অংশগ্রহণে সুযোগ এবং পেনশন নিশ্চিত।
যুক্তরাজ্য: ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের জন্য ফ্রি বাসপাস, উইন্টার ফুয়েল এলাউন্স, স্বাস্থ্যসেবায় ছাড়, এবং সামাজিক যত্নভাতা রয়েছে।
আমেরিকা: Social Security System প্রবীণদের অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ারসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে।
৩. বাংলাদেশের বাস্তবতা :
বাংলাদেশে এখনো আইন অনুযায়ী সিনিয়র সিটিজেনের বয়সসীমা নির্ধারণ হয়নি। তবে অনেক সরকারি নীতি বা প্রকল্পে অনানুষ্ঠানিকভাবে ৬০ বছর বা ৬৫ বছর ধরা হয়। কিছু সীমিত কর্মসূচি রয়েছে, যেমন:
বয়সভিত্তিক ভাতা কর্মসূচি (Old Age Allowance), যা বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ পান, তবে ভাতার পরিমাণ খুবই কম (মাসিক ৬০০ টাকা)।
প্রবীণ আইন ২০১৩ (Parents Maintenance Act) আছে, কিন্তু এটি মূলত সন্তানের ওপর পিতামাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব চাপায়, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে চলাফেরা, চিকিৎসা, আর্থিক ও সামাজিক সুযোগসুবিধা প্রবীণদের জন্য প্রায় অনুপস্থিত।
৪. সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা :
(১). আইনগত সংজ্ঞাহীনতা: বাংলাদেশে এখনো সিনিয়র সিটিজেনদের বয়স নির্দিষ্ট করে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।
(২). অপর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা: ভাতা খুবই সীমিত এবং অনেক প্রবীণই বাদ পড়ে যান।
(৩). স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা: সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য আলাদা সুবিধা নেই।
(৪). পরিবহন ও জনসেবায় বঞ্চনা: ট্রেন, বাস, বা বিমানে প্রবীণদের জন্য কোনো ছাড় নেই।
(৫). সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল: প্রবীণদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টার নেই বললেই চলে।
৫. সুপারিশ :
বাংলাদেশে ৬০ বছর বয়সে উপনীত নাগরিককে আইন দ্বারা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে নিচের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত:
(১). আইন প্রণয়ন :
“Senior Citizens Welfare Act” নামে আলাদা আইন প্রণয়ন।
৬০ বছর বয়সে পৌঁছালে নাগরিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র সিটিজেন মর্যাদা পাবেন।
(২). আর্থিক সুবিধা :
জাতীয় পেনশন স্কিমে বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি।
ব্যাংক আমানত ও সুদে করমুক্ত সুবিধা।
সরকারি ও বেসরকারি পরিবহনে কমপক্ষে ৫০% ভাড়া ছাড়।
(৩). স্বাস্থ্যসেবা :
প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে প্রবীণ-বান্ধব কাউন্টার ও ওয়ার্ড।
ওষুধে ভর্তুকি ও ফ্রি হেলথ চেক-আপ।
বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা স্কিম।
(৪). সামাজিক সুযোগ :
প্রতিটি জেলায় প্রবীণ কমিউনিটি সেন্টার বা ডে-কেয়ার।
প্রবীণদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
সরকারি সেবায় (যেমন ব্যাংক, অফিস, রেলস্টেশন) “Priority Service” নিশ্চিত।
(৫). আইন প্রয়োগ ও তদারকি :
প্রবীণ কল্যাণ বোর্ড গঠন করে জাতীয় নীতি বাস্তবায়ন।
প্রবীণদের প্রতি অবহেলা বা অপমান করলে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা।
৬. উপসংহার :
বাংলাদেশে জনসংখ্যার গড় আয়ু বাড়ছে; ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৮% মানুষ প্রবীণ (৬০+) এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এটি ২০%-এ পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুতরাং, এখনই আইনগত স্বীকৃতি দিয়ে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।