বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন
একটি বাসের স্টিয়ারিংয়ে যখন একজন নারী বসেন, তখন শুধু একটি গাড়িই এগিয়ে যায় না—এগিয়ে যায় একটি সমাজের মানসিকতাও। তাই সারাদেশে নারী চালিত বাসসার্ভিস চালুর উদ্যোগকে কেবল একটি পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। এটি হতে পারে নারীর নিরাপদ চলাচল, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার পথে একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু যদি এ ধরনের উদ্যোগের পথিকৃৎ হয়ে থাকে, তাহলে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তারেক রহমানের সরকার সারাদেশে নারী পরিচালিত বাসসার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিলে সেটি হবে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এখানে শুধু চালক নন—ড্রাইভার, কন্টাকটর ও হেলপার—তিন ভূমিকাতেই নারীরা দায়িত্ব পালন করবেন।
মহানবী (স) তাঁর আমলের বাহন/পরিবহন উট ও ঘোড়ার পরিবহনে নরীদের পুরুষদের পাশাপাশি সমান মর্যাদা দিয়ে একটি আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। বাস পরিবহনে আজ নারীদের প্রাগ্রসর ভূমিকা নবীর শিক্ষারই বহিঃপ্রকাশ বটে।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে নারীর নিরাপদ যাতায়াতে। গণপরিবহনে নারীকে নানা ধরনের হয়রানি, অশালীন আচরণ ও যৌন সহিংসতার আশঙ্কা মোকাবিলা করতে হয়। নারী পরিচালিত পরিবহনব্যবস্থা সেই ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নারীদের জন্য একটি অধিক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও তরুণীদের যাতায়াতে এটি নতুন আস্থা সৃষ্টি করবে।
তবে বিষয়টি শুধু বাসে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। রাইড-শেয়ারিং ও মোটরবাইক সার্ভিসেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে। নারী চালকের বাইকে নারী যাত্রী অফিসে যাবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, কর্মস্থলে যাবেন—নিজের প্রয়োজন ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে। এতে একদিকে যেমন নারীর চলাচলের স্বাধীনতা বাড়বে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
আমরা দেখেছি, চিকিৎসা পেশায় নারীরা এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েলি রোগের চিকিৎসায় পুরুষদের প্রয়োজনীয়তা রহিত হয়েছে। পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণও আজ নারীদের চেকিং নারীরাই করতে পারছে। অর্থাৎ যে পেশায় নারীর উপস্থিতি বাড়ে, সেই পেশার সামাজিক চরিত্রও ধীরে ধীরে বদলে যায়।
পরিবহন খাতেও একই পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। একজন নারী যখন বাস চালাবেন, আরেকজন নারী টিকিট দেবেন, অন্য একজন যাত্রীদের সহযোগিতা করবেন—তখন কর্মক্ষেত্রে নারীর সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান বার্তা ছড়িয়ে পড়বে। আজ যে কাজকে ‘পুরুষের কাজ’ বলা হয়, কাল সেটিই হয়ে উঠতে পারে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান কর্মক্ষেত্র।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—শুধু নারী কর্মী নিয়োগ করলেই নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চালক, কঠোর নিরাপত্তাবিধি, সিসিটিভি, জিপিএস, জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা, যথাযথ বেতন ও কর্মপরিবেশ এবং যাত্রীদের প্রতি জবাবদিহি। একই সঙ্গে নারী চালক ও কর্মীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
নারী চালিত বাসসার্ভিস তাই নিছক একটি পরিবহন প্রকল্প নয়। এটি হতে পারে নারীর কর্মসংস্থান, নিরাপদ যাতায়াত, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের সমন্বিত মডেল।
আজ স্টিয়ারিংয়ে একজন নারী।
কাল হয়তো সেই নারীই নিজের সংসার চালাবেন, সন্তানকে পড়াবেন, পরিবারের অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবেন। আর একদিন সমাজ হয়তো অবাক না হয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলবে—নারী বাস চালাচ্ছেন, নারী বাইক চালাচ্ছেন—এটাই তো স্বাভাবিক।
সেই দিনটিই হবে প্রকৃত সামাজিক বিপ্লবের দিন।