রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৯ অপরাহ্ন
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) প্রদান ও প্রবাস থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশন) যৌথভাবে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে।
এই প্রস্তাবের আওতায় তারেক রহমানসহ সব প্রবাসী বাংলাদেশিকে একটি অনলাইন যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় NID প্রদান ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগকে “গোপন ফাঁদ” বলে উল্লেখ করে বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তারেক রহমানের নাগরিক মর্যাদা ও ভোটাধিকার ঘিরে সরকার-বিএনপি দ্বন্দ্ব।
🟥 তারেক রহমান: বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু
২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০১৪ সালের জুন মাসে নিজের ও পরিবারের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্রিটিশ হোম অফিসে জমা দেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ২০১৮ সালে একাধিকবার সংসদে দাবি করেন—
> “তারেক রহমান আর বাংলাদেশের নাগরিক নন।”
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে তা জোরালোভাবে অস্বীকার করা হয়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন:
> “পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছিল শুধু রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়ায়। নাগরিকত্ব কোনোভাবেই ত্যাগ করা হয়নি। তিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।”
এই পরিস্থিতিতে, NID যাচাইয়ের নামে যদি তারেক রহমানকে ‘নাগরিক’ বা ‘অ-নাগরিক’ হিসেবে ঘোষিত করতে হয়, তবে তা বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।
🟩 জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বক্তব্য:
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ এই প্রস্তাবনার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন:
> “এই উদ্যোগ কারও বিরুদ্ধে নয়। এটি সমস্ত প্রবাসী বাংলাদেশির ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক উদ্যোগ। তারেক রহমান বা যে–কেউ—তাদের অবস্থান যা-ই হোক, যদি তিনি নাগরিক হন, তবে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে; যদি না হন, সেটিও রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত হবে আইনি প্রক্রিয়ায়।”
তিনি আরও বলেন:
> “প্রস্তাবটি নিয়ে যারা ভয় পাচ্ছেন, তারা হয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না, নয়তো নিজস্ব সংকটে আছেন।”
🟩 নির্বাচন কমিশনের অবস্থান:
নির্বাচন কমিশনের এক সদস্য বলেন:
> “আমরা ভোটার তালিকা আইনের আওতায় প্রবাসীদের তথ্য যাচাই করে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। কারো নাগরিকত্ব প্রমাণ বা বাতিল করা আমাদের দায়িত্ব নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা ইসির দায়িত্ব।”
কমিশনের প্রযুক্তি শাখা জানায়, প্রবাসে থাকা প্রায় ১.২ কোটি বাংলাদেশির জন্য একটি অনলাইন যাচাই পোর্টাল চালু করা হবে, যার মাধ্যমে তারা নিজ নিজ পরিচয়পত্র হালনাগাদ ও সংগ্রহ করতে পারবেন।
🟥 বিএনপির বিরোধিতা: বক্তব্য ও ব্যাখ্যা
এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিএনপির একাধিক নেতৃবৃন্দ কড়া ভাষায় মত দিয়েছেন:
শামা ওবায়দ (আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক):
> “এই প্রস্তাব তারেক রহমানকে নাজুক আইনি অবস্থানে নিতে চায়। সরকার চায় এই NID প্রক্রিয়ায় দেখাতে যে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক নন।”
নজরুল ইসলাম খান (স্থায়ী কমিটির সদস্য):
> “যারা বিদেশে নির্বাসনে আছেন, তাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে খেলতে চায় সরকার। নির্বাচন কমিশনকে তারা ব্যবহার করছে।”
জয়নুল আবেদিন ফারুক (চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা):
> “বিদেশে বসবাস করা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হঠাৎ ভোটার বানানোর নামে এটা রাজনৈতিক শিকার করার আয়োজন। এটা কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নয়।”
🧭 বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা:
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন:
> “বিএনপির আপত্তির পেছনে স্পষ্টভাবে তারেক রহমান ইস্যুই কেন্দ্রে রয়েছে। কারণ, যদি তিনি নাগরিক হন, তাহলে রাষ্ট্রপক্ষের ‘নাগরিকত্ব ত্যাগ’ দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হবে; আর যদি তিনি নিজেই প্রক্রিয়ায় না আসেন, তাহলে ‘নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় অস্বীকার’ বোঝাতে ব্যবহার করা হবে। এই দ্বৈত সংকটই বিএনপিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।”
✅ উপসংহার:
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা একটি সময়োপযোগী, সংবিধানসম্মত উদ্যোগ। কিন্তু তারেক রহমানের বিতর্কিত নাগরিকতা পরিস্থিতিকে ঘিরে বিএনপির আপত্তি এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে ফেলেছে।
এখন প্রশ্ন—ভোটাধিকার রক্ষা বড়, না রাজনৈতিক নেতৃত্ব রক্ষাই মুখ্য?