বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন
১. ভূমিকা :
২১শ শতাব্দীর এই দশককে অনেকেই “অশান্তির দশক” বলছেন। একদিকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন, অন্যদিকে সুদানে গৃহযুদ্ধ, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন, ইয়েমেনে সৌদি–হুথি সংঘাত, মায়ানমারে সামরিক জান্তার হত্যাযজ্ঞ—সব মিলিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত, ক্ষুধার্ত, যুদ্ধাহত। তবুও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা বড় শক্তিগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তে কার্যকর যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি নেই। প্রশ্ন জাগে—কেন মানবতার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্মগুলো নীরব বা অকার্যকর?
২. ভেটোর রাজনীতি: শান্তির পথে বৈরী প্রাচীর :
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল মঞ্চ হলেও পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা যুদ্ধবিরতির পথে প্রধান অন্তরায়।
গাজা: যুক্তরাষ্ট্র একাধিক প্রস্তাব ভেটো করেছে, ফলে বাধ্যতামূলক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি।
ইউক্রেন: রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ আনতে গেলে রাশিয়াই ভেটো দেয়।
সুদান ও ইয়েমেন: চীন ও রাশিয়া প্রায়ই পশ্চিমা প্রস্তাব আটকে রাখে।
অতএব, যেখানে যুদ্ধ চলছে, সেই সংঘাতের পক্ষভুক্ত দেশ বা তার মিত্রই ভেটো দিয়ে সিদ্ধান্ত ভেঙে দেয়। ফল: বিশ্ব-সমাজের আশা প্রতিবার ব্যর্থ হয়।
৩. আদালতের রায় ও বাস্তবতার দূরত্ব :
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) গাজা ও ইউক্রেন উভয় ক্ষেত্রেই মানবাধিকার রক্ষার আদেশ দিয়েছে। কিন্তু এসব রায় কার্যকর করার কোনো বলিষ্ঠ কাঠামো নেই। নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া রায় কাগজেই থেকে যায়। ফলে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে।
৪. অস্ত্র-বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ :
সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে অস্ত্র-বাণিজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় দেশগুলো একদিকে মানবাধিকারের বুলি আওড়ালেও অন্যদিকে যুদ্ধরত দেশগুলোতে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ পশ্চিমা অস্ত্রশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন এবং ইয়েমেনে সৌদি জোটের প্রতি সহায়তা অস্ত্র-চুক্তির সাথেই জড়িত।
যেখানে অস্ত্র হলো অর্থনীতি ও প্রভাবের হাতিয়ার, সেখানে শান্তি প্রায়শই পিছনে পড়ে যায়।
৫. জনপ্রতিবাদ ও বিশ্ব-সমাজের অচলাবস্থা :
বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছে—গাজা, ইউক্রেন, সুদান বা মায়ানমারের জন্য। কিন্তু এই প্রতিবাদ সরকারগুলোর নীতিতে কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারেনি। রাষ্ট্রগুলোর নীতি নির্ধারণে মানবিক আবেদন নয়, বরং ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি প্রভাব বিস্তার করে।
৬. তথ্যপ্রবাহ ও মিডিয়া-নিয়ন্ত্রণ :
গাজা ও সুদান: আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমিত, ফলে স্বচ্ছ তথ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত।
মায়ানমার: জান্তা মিডিয়া কঠোরভাবে দমন করছে।
ইউক্রেন: একতরফা বর্ণনার লড়াই চলছে—প্রচারণা যুদ্ধ বাস্তবতাকে বিকৃত করছে।
যখন জনগণের সামনে পূর্ণ সত্য পৌঁছায় না, তখন আন্তর্জাতিক চাপ দুর্বল হয়।
৬. মানবিক সংকট ও ডোনার ফ্যাটিগ :
জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ পাঠাতে সংগ্রাম করছে। কিন্তু অর্থাভাব প্রকট। গাজা থেকে সুদান পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ খাদ্য–জল–চিকিৎসার অভাবে কাতরাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাতাদের মধ্যে ‘ডোনার ফ্যাটিগ’ দেখা দিয়েছে।
৭. নীরবতার সমান্তরাল: গাজা, সুদান, ইউক্রেন, ইয়েমেন, মায়ানমার:
গাজা: গণহত্যা-সদৃশ পরিস্থিতি, শিশু–মহিলার ব্যাপক মৃত্যু।
সুদান: দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি, গোত্র-হত্যাযজ্ঞ।
ইউক্রেন: ইউরোপের কেন্দ্রে যুদ্ধ, বিশ্বশক্তির দ্বন্দ্ব।
ইয়েমেন: বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলির একটি।
মায়ানমার: জাতিগত নিপীড়ন, জান্তার দমননীতি।
সবখানেই চিত্র এক—রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভক্ত, ফলে মানবিক মূল্য উপেক্ষিত।
—
৮. উপসংহার :
চলমান সব যুদ্ধই দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ভেটোর জালে জড়ানো, আদালতের রায় দাঁতহীন, অস্ত্র-বাণিজ্য অর্থনীতির অঙ্গ, আর মানবিক তহবিল চিরকাল ঘাটতিগ্রস্ত। ফলে যুদ্ধবিরতির ডাক প্রতিবার ব্যর্থ হচ্ছে।
এই নীরবতা কেবল মানবতার প্রতি অবহেলা নয়, ভবিষ্যৎ বিশ্বশান্তির জন্য অশনি সংকেত। যদি বিশ্ব-সমাজ সত্যিই কার্যকর হতে চায়, তবে ভেটো ব্যবস্থার সংস্কার, অস্ত্র-বাণিজ্যে কড়া নিয়ন্ত্রণ, মানবিক সহায়তা ত্বরান্বিতকরণ ও তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই হবে। অন্যথায় গাজা, সুদান, ইউক্রেন, ইয়েমেন কিংবা মায়ানমার—সব ক্ষেত্রেই মানবতা পরাজিত হবে, আর সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থই জয়ী হবে।
—