রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২১ পূর্বাহ্ন
১. প্রারম্ভিকা
বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যে অনেক গৌরবময় নাম আছে, যারা তাঁদের কাজ দিয়ে জাতির মননে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তবে কিছু প্রতিভা আছেন যাঁদের অবদান ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে, যথাযথ স্বীকৃতি পাননি। এমনি একজন অসাধারণ মনীষী হলেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন—যিনি ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী, রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের রণসঙ্গীতের ইংরেজি অনুবাদক।
২. রণসঙ্গীত ও তাঁর অনুবাদ:
বাংলাদেশের জাতীয় রণসঙ্গীত—“চল চল চল”—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গানটি ছিল অসহ্য দুঃসহ লড়াইয়ের প্রেরণাদায়ক রণধ্বনি। পরবর্তীতে এই গানটিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রণসঙ্গীত হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
যদিও এর ইংরেজি অনুবাদটি বহুদিন ধরেই প্রচলিত, কিন্তু এর অনুবাদক হিসেবে কোথাও অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। অথচ বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিতভাবে জানা যায়, এই অনুবাদ কাজটি তাঁরই নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এটি ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প।
৩. অনুবাদের পেছনের প্রজ্ঞা:
অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন কেবল একজন ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিতই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যতাত্ত্বিক, অনুবাদক এবং চিন্তাবিদ। “চল চল চল” কবিতার মতো ছন্দময়, উদ্দীপ্ত, প্রগতিশীল কবিতাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার কাজ শুধু ভাষাগত দক্ষতা নয়, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতাও দাবি করে। এই অনুবাদ কেবল অর্থের নয়, আত্মার অনুবাদ—যা ড. সাজ্জাদ হোসেন সফলভাবে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।
৪. জাতীয় সঙ্গীত ও অনুবাদে নামের স্বীকৃতি:
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা”-এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আহসান এবং তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুবাদের জন্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন কেন উপেক্ষিত?
৫. স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা
অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের নাম শুধু ইতিহাসের একটি পাতায় নয়, দেশের প্রতিটি সামরিক অনুষ্ঠানে রণসঙ্গীত বাজানোর সময় উচ্চারিত হওয়া উচিত। তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা উচিত, যাতে তারা জানে এক সময় এক মনীষী ছিলেন যিনি কবিতা আর মাতৃভূমির প্রেমকে ভাষান্তরের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন।
৬ . উপসংহার
একটি জাতির নৈতিক শক্তি গড়ে ওঠে তার অতীতকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে। অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের মতো মনীষীদের যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ একটি আরও সুবিচারপ্রবণ ও স্মৃতিবান জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এখনই সময় তাঁকে রণসঙ্গীতের ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার।
৭. প্রস্তাবনা:
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর নাম রণসঙ্গীত অনুবাদক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হোক।
স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
তাঁর অনুবাদকৃত রণসঙ্গীতটি তাঁর নামসহ প্রকাশ করা হোক সরকারি নথি ও প্রচারপত্রে।
“সম্মান যাঁর প্রাপ্য, স্বীকৃতি হোক তাঁর প্রাপ্তি।”
অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের অবদান জাতির ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকুক—ভুলে যাওয়া অধ্যায় নয়।