বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৩ অপরাহ্ন
১. বঙ্গভবনের নীরবতা :
বঙ্গভবনের আকাশে আজকাল পাখিরাও চুপচাপ।
যেন তারা জানে—এই প্রাসাদের জানালা খুললেও কোনো আহ্বান ভেসে আসে না রাষ্ট্রের অন্তর থেকে। রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন চুপ্পু সেই নিঃশব্দতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে বসে আছেন—কিংবা বলা যায়, ইতিহাসের এক নীরব প্রহরী হয়ে দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে তার।
বলা হয়, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের পিতা—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে যিনি বসেন, তার প্রতিটি বাক্য একেকটি প্রতিধ্বনি তোলে প্রশাসনের হৃদয়ে। কিন্তু এই রাষ্ট্রপতির বাক্যে কোনো প্রতিধ্বনি নেই; তার কলমে কোনো নীতি তৈরি হয় না, তার নীরবতা রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো আলো জ্বালে না।
প্রধানমন্ত্রী অফিসের সভাকক্ষ থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত—সবকিছুই চলছে তার অনুপস্থিতিতেই। রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে তার নাম এখন কেবল এক অলঙ্কার, যেন ইতিহাসের প্রাচীন কোনো প্রতীক—যার রঙ উজ্জ্বল, কিন্তু অর্থ ফিকে।
২. নিঃসঙ্গ বিলাসিতা :
বঙ্গভবনের ভেতরটি যেন এক নিঃশব্দ প্রাসাদ। নরম আলোকিত লবি, রেশমি পর্দা, ঝাড়বাতির নিচে নরম পায়ের শব্দ—সবকিছুই আছে, কেবল নেই রাষ্ট্রের স্পন্দন।
একান্ত নিরবতায় বসে আছেন শাহাবুদ্দিন চুপ্পু—যেন রাষ্ট্রের নয়, সময়ের কোনো বন্দী।
চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়েও পাননি তিনি। অথচ বঙ্গভবনের ভেতরে চলছে বিলাসবহুল জীবনযাপন—রেশমি টেবিলক্লথে সাজানো নৈশভোজ, আরামকেদারায় নিঃশব্দ বিকেল, মখমলের পর্দার আড়ালে নিঃশব্দ নিঃসঙ্গতা।
যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নয়, তিনি বন্দী নিজের নিস্তব্ধ গৌরবে।
৩. নীরবতার রাজনীতি :
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর এই নীরবতা কেবল শারীরিক নয়—এটি রাজনৈতিক নীরবতা, যা আজ প্রজাতন্ত্রের হৃদয়ে একটি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
একজন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর নয়; তিনি জাতির বিবেকের প্রতীক, রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতিফলন। কিন্তু আজ সেই প্রতিফলন যেন ঝাপসা আয়নায় হারিয়ে গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন,
> “বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিরপেক্ষ ও ভারসাম্য রক্ষাকারী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন রাষ্ট্রপতি কেবল একটি প্রতীক—যে প্রতীক কথা বলে না, প্রশ্ন করে না, কেবল চুপচাপ বসে থাকে।”
এমনকি জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতেও তাকে সচরাচর দেখা যায় না। স্বাধীনতা দিবস, শহীদ দিবস, কিংবা মহান বিজয় দিবস—সবখানেই রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি এক অদৃশ্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
৪. এক রাজপ্রাসাদের নিঃসঙ্গ কবিতা :
যদি বঙ্গভবনের দেয়াল কথা বলত, তারা হয়তো বলত—“আমরা কেবল বিলাসের সাক্ষী, দায়িত্বের নয়।”
সেখানে প্রতিদিন বাজে ঘড়ির কাঁটা, কিন্তু রাষ্ট্রের সময় থেমে আছে।
বাগানের গোলাপ ফোটে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি ঝরে পড়ে শুকনো পাতার মতো।
রাষ্ট্রপতির জীবন এখন যেন এক রাজকীয় গল্প, যার নায়ক নিঃসঙ্গ, দর্শক অনুপস্থিত, এবং পর্দা নামার আগেই নাটক শেষ।
৫. রাষ্ট্রের প্রশ্ন: থাকা না-থাকার পার্থক্য কোথায়:
একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি নেই কোনো সিদ্ধান্তে, নেই কোনো পরামর্শে, নেই কোনো আলোচনায়—তার থাকা বা না-থাকা কি রাষ্ট্রের জন্য কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে?
প্রশ্নটা আজ কেবল রাজনীতির নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরও।
একজন প্রবীণ বিশ্লেষক কটাক্ষ করে বলেন,
> “বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি এখন প্রজাতন্ত্রের ‘নীরব প্রতীক’। তিনি আছেন, কিন্তু কার্যত নেই—যেমন আকাশে চাঁদ দেখা যায়, কিন্তু আলোকিত হয় না পৃথিবী।”
৬. এক নিঃশব্দ রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি :
বঙ্গভবনের দরজা বন্ধ হলে বাইরে পড়ে থাকে রাষ্ট্রের বাস্তবতা। জনগণের প্রশ্ন, প্রশাসনের ব্যস্ততা, রাজনীতির উন্মত্ততা—সব কিছুর বাইরে এক নিঃশব্দ প্রাসাদে বসে আছেন এক রাষ্ট্রপতি, যিনি শুনছেন, কিন্তু বলছেন না; জানেন, কিন্তু করছেন না।
শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বর্তমান অবস্থান যেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক রূপক—যেখানে পদ আছে, কিন্তু দায়িত্ব নেই; মর্যাদা আছে, কিন্তু প্রভাব নেই; নাম আছে, কিন্তু কণ্ঠ নেই।
৭্ নি:শব্দে বেঁচে থাকা :
রাষ্ট্রপতি আজ যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের এক নিঃশব্দ প্রতীক—এক বিলাসী নিঃসঙ্গতার প্রতিমূর্তি, যিনি ইতিহাসের প্রাসাদে বসে আছেন, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রাণস্পন্দনে তার কোনো ছোঁয়া নেই। বঙ্গভবন আজ যেন সোনার খাঁচায় বন্দী এক পাখি—যে গান ভুলে গেছে, উড়তেও পারে না, কেবল ঝলমলে আলোয় নিঃশব্দভাবে বেঁচে আছে।