বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫২ অপরাহ্ন
*১. একটি গ্রেফতার, একটি বিপ্লব অবসান নয় কি*:
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি সিলেট–হবিগঞ্জ অঞ্চলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানের গ্রেফতার কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঘটনা নয়। এটি আসলে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—যা ইতিহাসে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত—তার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ এবং দমননীতির একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।
মাহদী হাসানকে গ্রেফতার করে এবং পরদিন জামিনে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্র যেন একটি বার্তা দিয়েছে—জুলাই বিপ্লব এখনও রাষ্ট্রের চোখে সম্মানিত অধ্যায় নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত ও শাসিত স্মৃতি।
*২. মাহদী হাসান: ব্যক্তি নয়, বিপ্লবের প্রতীক*:
মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিব। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
৩ জানুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যায় শায়েস্তাগঞ্জে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ—পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তার কাজে বাধা এবং একটি প্রতিবাদ মিছিলে থানার ওসিকে হুমকি দেওয়া। পরদিন ৪ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ২০০ টাকা মুচলেকায় তাঁকে জামিন দেন।
আইনগতভাবে ঘটনাটি ছোট হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি বড়, কারণ যে রাষ্ট্র জুলাই বিপ্লবের শহিদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই রাষ্ট্রই এখন বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে হাত বাড়াচ্ছে।
*৩. প্রশ্নটা মাহদী হাসানকে ঘিরে নয়, রাষ্ট্রকে ঘিরে*:
মাহদী হাসানের গ্রেফতার প্রশ্ন তোলে—
জুলাই বিপ্লবের কোনো নেতাকে কেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি?
কেন বিপ্লবের আইনি ভিত্তি এখনও অনির্ধারিত?
কেন বিপ্লবের সময় সংঘটিত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান নয়, অথচ বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে মামলা সক্রিয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলেই বোঝা যায়—গ্রেফতার কেবল একজনকে নয়, একটি বিপ্লবী চেতনাকেই লক্ষ্য করে।
*৪. ইউনূস সরকার: নৈতিক ঋণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা*:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই বিপ্লবের জনচাপ ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের ফল। ফলে এই সরকারের ওপর বিপ্লবের প্রতি একটি সুস্পষ্ট নৈতিক দায় বর্তায়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—
জুলাই বিপ্লবের কোনো রাষ্ট্রীয় ঘোষণাপত্র নেই;
শহিদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও দায় নির্ধারণ প্রক্রিয়া অনুপস্থিত;
বিপ্লবী কর্মীদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
এই প্রেক্ষাপটে মাহদী হাসানের গ্রেফতার একটি প্রশ্নকে জোরালো করে—ইউনূস সরকার কি বিপ্লবের উত্তরাধিকার রক্ষা করছে, নাকি তা নিরবেই নিষ্ক্রিয় করছে?
*৫. কেন নির্বাচন আছে, বিপ্লবের ভিত্তি নেই*:
ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য দ্রুত নির্বাচন আয়োজন। কিন্তু বিপ্লবের সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না করেই এই নির্বাচন আয়োজনের তাড়াহুড়ো গভীর সন্দেহ তৈরি করে।
নির্বাচন যদি বিপ্লবের বিচার, সংস্কার ও দায়বদ্ধতার আগেই অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতাকাঠামোকেই পুনর্বৈধতা দিতে পারে। মাহদী হাসানের গ্রেফতার সেই আশঙ্কার বাস্তব উদাহরণ।
*৬. বিপ্লবীদের নিরাপত্তা: অদৃশ্য আতঙ্ক*:
মাহদী হাসান জামিনে মুক্ত। কিন্তু গ্রেফতার নিজেই একটি সতর্কবার্তা—
বিপ্লবী নেতারা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অরক্ষিত;
পুরনো মামলা ও অভিযোগ নতুন করে সক্রিয় হতে পারে;
প্রশাসনের ভেতরের পুরনো আনুগত্য কাঠামো এখনও অটুট।
এই বাস্তবতায় বিপ্লবীদের জীবন, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে হুমকির মুখে, তা অস্বীকার করা যায় না।
*৭.কোন পরিণতির পথে চলছে জুলাই বিপ্লব*:
যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে জুলাই বিপ্লবের সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে—
(১). বিপ্লবের ধীরে ধীরে অপরাধীকরণ;
(২). নেতৃত্বের মনোবল ও সংগঠনের ভাঙন;
(৩). পুরনো ক্ষমতাকাঠামোর নির্বিঘ্ন প্রত্যাবর্তন;
(৪). ভবিষ্যতে আরও তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক বিস্ফোরণ।
*৮. মাহদী হাসান নয়, গ্রেফতার হয়েছে জুলাই*:
মাহদী হাসানের গ্রেফতার প্রমাণ করে—আজ রাষ্ট্র যাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে, তিনি একা নন। কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে পুরো জুলাই বিপ্লবকে।
যদি বিপ্লবীদের সম্মান, নিরাপত্তা ও আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত না করা হয়, তবে ইতিহাস একদিন কঠিন প্রশ্ন তুলবে—
জুলাইয়ের শহিদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এল, সে সরকার কি শেষ পর্যন্ত সেই বিপ্লবকেই গ্রেফতার করলো?