বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫—একটি তারিখ, দুটি বিপরীত অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়ানো। একদিকে উৎসবের প্রস্তুতি, ঢোল-ঢাকের গর্জন, পতাকার ঢেউ। অন্যদিকে হাসপাতালের নিঃশব্দ ঘর, মনিটরের কাঁপা রেখা, নিভু নিভু আলোয়ত মায়ের নিঃশ্বাসের অনিশ্চিত ওঠানামা। এই দ্বন্দ্ব শুধু রাজনীতির নয়—এ দ্বন্দ্ব রক্তের, হৃদয়ের, সন্তানের অস্তিত্বের।
সতেরো বছরের দীর্ঘ প্রবাস শেষে দেশে ফেরা—এটি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের মুহূর্ত। রাজপথে জনতার ঢল নামবে, কণ্ঠে কণ্ঠে উঠবে স্লোগান। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। মঞ্চে আলো বসানো হয়েছে, ব্যানার ঝুলেছে, প্রতিটি ইঞ্চি জায়গায় লেখা—স্বাগত। কিন্তু এই ‘স্বাগত’-এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব প্রশ্ন, যা কোনো স্লোগান দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না—দেশের মাটিতে পা রাখার পর প্রথম পথটি কোথায় যাবে? মায়ের কাছে, না মঞ্চের দিকে?
হাসপাতালের করিডরে সময় অন্যভাবে হাঁটে। এখানে মিনিট মানে একেকটি জীবন, একেকটি আশঙ্কা। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা যখন এগোয়, মনে হয় মায়ের নিঃশ্বাসও তার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। সেই ঘরে শুয়ে আছেন বেগম খালেদা জিয়া—একসময় যিনি ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক, রাষ্ট্রের দৃঢ় কণ্ঠ। আজ তিনি নিঃশব্দ যুদ্ধে একা। তার পাশে একটি চেয়ার খালি—সেই খালি চেয়ার কি সন্তানের জন্যই রাখা ছিল না?
মায়ের স্মৃতি মানে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়; মায়ের স্মৃতি মানে আশ্রয়, শাসন, সাহস। ছোটবেলার প্রতিটি ভয়, প্রতিটি ব্যথা গিয়ে লুকাত মায়ের আঁচলে। আজ সেই আঁচল নিস্তেজ, শয্যাশায়ী। এমন সময়ে সন্তানের হৃদয় কি উৎসবের আলো সহ্য করতে পারে? ঢোলের শব্দ কি মায়ের নিঃশ্বাসের শব্দকে চাপা দিতে পারে?
রাজপথে তখন অন্য দৃশ্য। জনতার ঢেউ উঠছে-নামছে। কেউ কেউ বলছেন—এটি রাজনৈতিক মুহূর্ত, জনতার আবেগ, ইতিহাসের দাবি। কিন্তু ইতিহাস কি কখনো মানবিকতার ঊর্ধ্বে? জনতার প্রত্যাশা কি মায়ের একটুখানি সান্নিধ্যের চেয়েও ভারী? প্রশ্নগুলো আজ কেবল কাগজে নয়, বাতাসে ভাসছে।
এই আয়োজনের পেছনে যুক্তির পাহাড় দাঁড় করানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে—এটি শক্তির প্রদর্শন, এটি মনোবল। কিন্তু শক্তি কি কেবল সংখ্যায়? শক্তি কি কেবল মঞ্চের উচ্চতায়? নাকি শক্তি লুকিয়ে থাকে সেই মুহূর্তে, যখন একজন সন্তান মায়ের হাত ধরে বলে—“আমি আছি”?
রাজনীতির হিসাবনিকাশে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষা সহজ। কেউ বলছেন, এই সংবর্ধনা রাজনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে; কেউ বলছেন, এতে শক্তি বাড়বে। কিন্তু এই অঙ্কের বাইরে পড়ে থাকে একটি হিসাব—হৃদয়ের হিসাব। মানবিকতার হিসাব। এই হিসাবের খাতা লেখা হয় না স্লোগান, লেখা হয় কান্না।
হাসপাতালের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাতের বাতাস কেঁপে ওঠে। মনে হয়, সেখান থেকে ভেসে আসে এক মায়ের নীরব ডাক—“এসো।” সে ডাক কি শোনা যায় মাইকের শব্দে? নাকি মাইকের প্রতিধ্বনিতে হারিয়ে যায় সন্তানের বুকফাটা আর্তনাদ?
ইতিহাস একদিন নির্দয়ভাবে প্রশ্ন করবে। সে প্রশ্নে থাকবে না আবেগের ছাড়। সে প্রশ্ন হবে সোজা—সেদিন, যখন মা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন প্রথম পা পড়েছিল কোথায়? মায়ের শয্যার পাশে, না উৎসবের মঞ্চে?
এই লেখাটি কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়, কোনো ব্যক্তির পক্ষেও নয়। এটি এক সন্তানের ভেতরের কান্নার দলিল। এটি সেই করুণ উপন্যাস, যার প্রতিটি অনুচ্ছেদ দীর্ঘশ্বাসে লেখা। পাঠক যদি পড়তে পড়তে চোখের পানি ফেলেন, জানবেন—এ কান্না রাজনীতির নয়। এ কান্না মায়ের। এ কান্না সন্তানের। আর সেই কান্নার সামনে কোনো সংবর্ধনা, কোনো ঢোল-ঢাক, কোনো আলো—কখনোই বড় হতে পারে না।