বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন
*২০ হাজার কিমি খাল ও ৫০ কোটি গাছ : তারেক রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত প্ল্যান বটে*
——অধ্যাপক এম এ বার্ণিক
*১. আজগুবি প্ল্যান* :
ক্ষমতায় গেলে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং ৫০ কোটি গাছ রোপণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন— “I have a plan”। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মোড়কে উপস্থাপিত এই বক্তব্য প্রথম দর্শনে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও গভীর বিশ্লেষণে এটি বিজ্ঞান, ভূগোল ও বাস্তব পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এক রাজনৈতিক স্লোগান বলেই প্রতীয়মান হয়।
এই প্রতিবেদনে দাবি দুটির ফ্যাক্টচেক, ভূগোলগত সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং পরিকল্পনার অন্তঃসারশূন্যতা ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
*২. ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের দাবি ও বাস্তবতার সংঘর্ষ*
*(১) যাচাইকৃত তথ্য*
বাংলাদেশের মোট আয়তন: ≈ ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিমি
বিদ্যমান নদী–খাল–নদীনালার মোট দৈর্ঘ্য: ≈ ২৪–২৫ হাজার কিমি
গত ৫০ বছরে ভরাট/দখল হওয়া খাল: ≈ ৪০–৫০%
*(২)বিশ্লেষণ*:
২০ হাজার কিমি নতুন খাল খনন মানে—
বিদ্যমান জলপথের প্রায় সমান আরেকটি নেটওয়ার্ক তৈরি।
বিপুল কৃষিজমি অধিগ্রহণ।
বসতভিটা ও অবকাঠামো উচ্ছেদ।
সামাজিক ও পরিবেশগত অস্থিরতা।
পানি ব্যবস্থাপনায় সামাল দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন খাল নয়, ভরাট হওয়া খালের পুনঃখননই (re-excavation) একমাত্র যৌক্তিক পথ। সেখানে নতুন ২০ হাজার কিমি খালের কথা বলা ভূগোল ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা না-বোঝার প্রমাণ।
*(৩)ফ্যাক্টচেক রায়*:
২০ হাজার কিমি নতুন খাল খনন বাস্তবসম্মত নয়,
আংশিকভাবে সম্ভব এবং তা হবে পুরনো খাল পুনঃখনন।
*৩. ৫০ কোটি গাছ: অঙ্কে বড়, বাস্তবে অসম্ভব*
(১)বৈজ্ঞানিক হিসাব:
একটি মাঝারি গাছের জন্য প্রয়োজন: ৮–১২ বর্গমিটার। তা-হলে,
৫০ কোটি গাছের জন্য ন্যূনতম জমি: ≈ ৫,০০০ বর্গকিমি
যা বাংলাদেশের মোট ভূমির ≈ ৩.৪%
(২) ভূমি বাস্তবতা:
বনভূমি ইতোমধ্যে নেমে এসেছে ১০–১১%
কৃষিজমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
নগরায়ন ও শিল্পায়ন সম্প্রসারিত হচ্ছে।
অর্থাৎ, ৫০ কোটি গাছ রোপণের মতো খালি জমি বাংলাদেশের নেই।
(৩) আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য:
বৃহৎ বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে গাছের গড় টিকে থাকার হার ৫০–৬০%।
ফলে ৫০ কোটি গাছ লাগালেও বাস্তবে টিকে থাকবে সর্বোচ্চ ২৫–৩০ কোটি গাছ।
অতএব, ফ্যাক্টচেক রায়:
৫০ কোটি গাছ একসাথে রোপণের দাবি অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর।
*৪. পরিকল্পনা নয়, সংখ্যার রাজনীতি*:
একটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় থাকা আবশ্যক—
বাস্তবায়ন টাইমলাইন,
বাজেট,
জমির উৎস,
পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA),
প্রজাতি নির্বাচন,
প্রশাসনিক কাঠামো।
দুর্ভাগ্য যে, তারেক রহমানের “I have a plan” বক্তব্যে—
কোনো টাইমলাইন নেই,
কোনো বাজেট নেই,
কোনো মানচিত্র নেই,
কোনো পরিবেশগত বিশ্লেষণ নেই।
অতএব, এটি পরিকল্পনা নয়; এটি সংখ্যা ছুড়ে দেওয়ার রাজনীতি।
*৫. পরিবেশবাদ না কি পরিবেশ নিয়ে প্রতারণা*:
অপরিকল্পিত খাল খননের ঝুঁকি—
লবণাক্ত পানি প্রবেশ,
প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত,
জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস,
ভুল প্রজাতির গাছ রোপণের ঝুঁকি,
পানিশূন্যতা,
মাটির উর্বরতা হ্রাস,
স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি।
এই মৌলিক ঝুঁকিগুলো নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা না থাকা প্রমাণ করে যে, পরিবেশ এখানে লক্ষ্য নয়—এটি রাজনৈতিক মোড়ক মাত্র।
*৬. মস্তষ্কপ্রসূত কল্পনা, কিন্তু পরিকল্পনা নয়*:
পরিকল্পনা মানে স্লোগান নয়। পরিকল্পনা মানে ভূগোল বোঝা, বিজ্ঞান মানা এবং বাস্তব সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা।
কিন্তু ২০ হাজার কিমি খাল ও ৫০ কোটি গাছ–সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি।
ফলে “I have a plan” বক্তব্যটি বিশ্লেষণে দাঁড়িয়ে যায় এক প্রশ্নের মুখে—
এটি কি পরিকল্পনা,
নাকি “সংখ্যা আছে, কিন্তু ধারণা নেই”—এই বাস্তবতারই রাজনৈতিক স্বীকারোক্তি?
রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ এমন শূন্য পরিকল্পনার ওপর দাঁড়াতে পারে না।