সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন
কখনো কখনো ইতিহাস এমন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, যার উত্তর সংখ্যার খাতায় মেলে না। সেগুলো খুঁজতে হয় মায়ের অশ্রুজলে, বিধবার নীরবতায়, কিংবা সেই শিশুর চোখে, যে এখনও দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে—তার বাবা হয়তো ফিরে আসবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে। রাজপথে তখন শুধু স্লোগান ছিল না; ছিল গুলির শব্দ, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, হাসপাতালের করিডোরে ছুটে চলা উদ্বিগ্ন স্বজনদের আর্তনাদ, আর ছিল এমন সব তরুণের নিথর দেহ, যাদের বুকভরা স্বপ্ন এখনও পূর্ণ হওয়ার সুযোগ পায়নি।
সেই রক্তাক্ত অধ্যায়কে ঘিরেই আবারও আলোচনায় এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে প্রেরিত একটি আইনি পত্র। লন্ডনের ব্যারিস্টার স্টিভেন পাওলস কেসি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রায় ১,৪০০ জন নিহতের সংখ্যা বাংলাদেশ সরকারের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; তাই বিষয়টির পুনঃতদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু সংখ্যার এই বিতর্কের মাঝখানে যেন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের গল্প।
জাতিসংঘ বলছে—প্রায় ১,৪০০ প্রাণ ঝরে গেছে।
বাংলাদেশ সরকারের যাচাইকৃত খসড়া তালিকায় রয়েছে ৮৫৮ জনের নাম।
সংখ্যা দুটি আলাদা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে মায়ের সন্তান আর ফিরে আসেনি, তার কাছে ৮৫৮ আর ১,৪০০-এর পার্থক্য কতটুকু?
যে স্ত্রী স্বামীর রক্তমাখা শার্ট বুকে জড়িয়ে রাত কাটায়, তার কাছে কোন সংখ্যাটি সঠিক?
যে শিশুটি বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ঈদের দিন কাঁদে, তার কাছে পরিসংখ্যানের ভাষা কি কোনো অর্থ বহন করে?
সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
তদন্ত নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে।
কিন্তু কবরগুলোর মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।
কবরের মাটি কখনো মিথ্যা বলে না।
রাজপথের রক্তও কখনো সংখ্যার রাজনীতি বোঝে না।
সেদিন যারা প্রাণ হারিয়েছিল, তারা কেউ কোনো পরিসংখ্যান ছিল না। তারা ছিল কারও সন্তান, কারও বাবা, কারও ভাই, কারও স্বপ্ন। তাদের একজন হয়তো চিকিৎসক হতে চেয়েছিল, আরেকজন প্রকৌশলী, কেউবা শিক্ষক। কিন্তু গুলির শব্দ তাদের ভবিষ্যৎকে থামিয়ে দিয়েছিল সময়ের আগেই।
আজ যখন সেই ঘটনার মৃত্যুসংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে, তখন বাংলাদেশের বাতাসে যেন আবারও ভেসে আসে হাসপাতালের সেই কান্না, মর্গের সেই দীর্ঘশ্বাস, আর কবরস্থানের সেই নিঃশব্দ আহাজারি।
সমালোচকদের একটি অংশ বলছেন, চিঠিটি সংখ্যার বিষয়ে আপত্তি তুললেও ঘটনাটির ভয়াবহতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, এটি কেবল তথ্যগত সংশোধনের দাবি। কিন্তু বিতর্কের উভয় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদেরও হয়তো একটি বিষয়ে একমত হতে হবে—
মানুষের জীবন কখনো শুধু সংখ্যা নয়।
৮৫৮ জন নিহত হোক কিংবা ১,৪০০ জন—প্রতিটি মৃত্যুই একটি সম্পূর্ণ পৃথিবীর মৃত্যু।
প্রতিটি লাশের সঙ্গে দাফন হয়েছে একটি পরিবারের হাসি।
প্রতিটি কবরের নিচে শুয়ে আছে একটি অসমাপ্ত গল্প।
ইতিহাসের আদালতে একদিন হয়তো সব তথ্য পরিষ্কার হবে। হয়তো তদন্তের পর তদন্ত হবে। হয়তো সংখ্যার অমিল দূর হবে। কিন্তু যে মা সন্তানের রক্তমাখা জামা এখনও আলমারিতে তুলে রেখেছেন, তার হৃদয়ের বিচার কি কোনো কমিশন করতে পারবে?
সন্ধ্যা নামলে আজও হয়তো বাংলাদেশের কোনো গ্রামে একজন মা আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেন, “আমার ছেলেটা যদি আরেকবার ফিরে আসত…”
সেই আর্তনাদের সামনে ৮৫৮ কিংবা ১,৪০০—সব সংখ্যা যেন ছোট হয়ে যায়।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো—
রক্তের হিসাব কাগজে লেখা যায়, কিন্তু রক্তের বেদনা কখনো লেখা যায় না।
সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু একটি মায়ের কান্নার কোনো সংখ্যা নেই।